দেশজুড়ে চলছেই চাল নিয়ে প্রতারণা। ছাঁটাইয়ে অপচয় করা হচ্ছে লাখ লাখ টন। নষ্ট হচ্ছে খাদ্যমান। ব্রি-২৮ হয়ে যাচ্ছে মিনিকেট। ব্রি-২৯ হচ্ছে নাজিরশাইল। মোটা ধান মেশিনে ছেঁটে চিকন করা চাল কিনে নিজেদের নামে বাজারজাত করছে বিভিন্ন প্রসিদ্ধ কোম্পানি।
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে চাল অতিমাত্রায় পলিশ (ছাঁটাইয়) করে ‘মিনিকেট’ হিসেবে বাজারে ছাড়ছেন মিল মালিকরা।
চালের যথাযথ পুষ্টিমান রক্ষা ও অপচয় রোধে ২০২৩ সালে সরকার চাল পলিশ ও তা ভুয়া নামে বিক্রি করা নিষিদ্ধ করে।
‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, হস্তান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন আইন-২০২৩’ অনুযায়ী, কোনো খাদ্যদ্রব্যে থাকা প্রাকৃতিক উপাদান সম্পূর্ণ বা আংশিক অপসারণ বা পরিবর্তন করে তা উৎপাদন বা বিপণন নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
একই আইনে খাদ্যশস্য থেকে উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যকে উপজাত হিসেবে উল্লেখ না করে ভিন্ন বা কাল্পনিক নামে বাজারজাত করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে মিলাররা বিভিন্ন জাতের চাল পলিশ অব্যাহত রেখেছেন এবং সেগুলো মিনিকেট হিসেবে বিক্রি করছেন। তাদের দাবি, এখনো চাল পলিশ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশিকা তারা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে পাননি। বাংলাদেশে ভাত একটি প্রধান খাদ্য এবং কার্বোহাইড্রেটের প্রাথমিক উৎস। কৃষি
সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় তিন কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়। আর মাথাপিছু দৈনিক খরচ হয় গড়ে ৪৯৩ গ্রাম চাল, যা একজন ব্যক্তির ক্যালরি গ্রহণের ৫৮ শতাংশ। গবেষকরা বলেন, চাল অতিরিক্ত পলিশ করলে এতে থাকা আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘বি’র মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান কমে যায়। অথচ স্বাস্থ্যের জন্য এসব উপাদান অত্যাবশ্যক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, চাল ১০ শতাংশ বা এর বেশি পলিশ করলে তা থেকে ৯-১৮ শতাংশ প্রোটিন, ৮- ১৯ শতাংশ ফাইবার, ৬-২১ শতাংশ ম্যাগনেসিয়াম ও ৮-৫০ শতাংশ পর্যন্ত ফলিক অ্যাসিড কমে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, চাল ১০ শতাংশের বেশি পলিশ করলে প্রতি বছর ১৬ লাখ মেট্রিক টনের অপচয় হয়, যা মোট চাহিদার দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অটোরাইস মিলগুলোতে রয়েছে ডিজিটাল সেন্সর প্লান্ট। এর মাধ্যমে যে কোনো ধান বা চাল থেকে প্রথমে কালো, ময়লা ও পাথর সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর মোটা ধান চলে যায় অটোমিলের বয়লার ইউনিটে। সেখানে পাঁচটি ধাপ পার হয়ে চাল সাদা রং ধারণ করে। এরপর আসে পলিশিং মেশিনে। অতি সূক্ষ্ম এই মেশিনে মোটা চালের চারপাশ কেটে চিকন করা হয়। সেটি আবারও পলিশ ও স্টিম দিয়ে চকচকে শক্ত আকার দেয়া হয়। সবশেষে এই চাল কথিত এবং আকর্ষণীয় মিনিকেট চালে পরিণত হয়। এসব কারণে মোটা চালের যত উৎপাদন হয় তার সবটা বাজারে পাওয়া যায় না। প্রতি বছর উৎপাদিত চালের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাজারে যাওয়ার আগেই অদৃশ্য হয়ে যায়। চিকন চালের দাম বেশি হওয়ায় এখন মোটা চালের দামও ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক পরিমাণে ঘষে ফেলার কারণে চালে ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদন কমে যায়। থাকে শুধু কার্বোহাইড্রেটের অংশ।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, এরকম কোথাও কোথাও হচ্ছে, যা আমরা চিহ্নিত করেছি। নতুন খাদ্য পরিবহন ও ব্যবসা পরিচালনা সংক্রান্ত আইন হয়েছে। বিধিমালা তৈরি করতে একটু দেরি হয়েছে। তিন দিন আগে আমাদের হাতে বিধিমালা এসেছে। এটি শিগগিরই বন্ধ করা হবে। জানা গেছে, মোটা চাল চিকন করার অন্যতম বাজার বগুড়ার সান্তাহারে। এ ছাড়া দুপচাঁচিয়া, শেরপুর শহরের শতাধিক অটো রাইস মিলে মোটা চাল কেটে-ছেঁটে নামিদামি জাতের
ব্র্যান্ডিং তৈরি করা হয়। সান্তাহারেই প্রায় দেড় ডজন অটোরাইস মিল রয়েছে। শেরপুর উপজেলা শহরে ১৫টি বাছাই মিল রয়েছে। এসব অটোরাইস মিলে মিনিকেট, কাটারি, পাইজাম, বিআর-২৮, বিআর- ২৯, চিনিগুড়া, নাজিরশাইল চাল উৎপাদন করা হয়। মিনিকেট ও নাজিরশাইল নামে ধানের কোনো জাত নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্রি-২৮ এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রি-২৯ ধান কেটে মিনিকেট নামে বাজারজাত করা হয়। ব্রি-২৯ ধান অধিক ছাঁটাই ও পলিশ করে চালের নাম দেয়া হয় নাজিরশাইল।
বুশরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ খান জানান, বুশরা অটোরাইস মিলে ধানের গুণগতমান যাচাই করে চাল উৎপাদন করা হয়। মোটা চাল ছেঁটে চিকন করার সুযোগ নেই। মোটা ধানের চাল মোটা আকারেই বিক্রি করা হয়।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান, বর্তমানে বগুড়ায় উৎপাদিত ধানের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই হাইব্রিড জাতের। বাজারে গেলে ব্রি-২৮, পাইজাম, নাজিরশাইল, মিনিকেটসহ আরো দু- একটি জাত ছাড়া অন্য ধানের চাল পাওয়া যায় না। অভিযোগ পেয়েছি ৮ থেকে ১০ প্রজাতির ধান একত্রে চাল করা হচ্ছে। বগুড়া জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক হুমায়ুন কবির জানান, মোটা চাল চিকন করার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসমাইল হোসেন বলেন, আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, চাল পলিশ করা যাবে না। (যদিও) নীতিমালায় রাইস পলিশিংয়ের জন্য শতাংশ নির্দিষ্ট করা হয়নি, তবে আইন লঙ্ঘন করার কোনো উপায় নেই।
মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, চাল পলিশ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে এবং বর্তমানে তা বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট প্রিন্টিং অফিসে রয়েছে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, দেশে প্রতি বছর চার কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়। এই চাল উজ্জ্বল করতে পাঁচবার পলিশ করা হয়। এতে চালের ওজন চার থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে বার্ষিক চাল উৎপাদন কমেছে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। চাল দুইবার পলিশ করলে একদিকে চালের পুষ্টিগুণ বাড়বে, অন্যদিকে লোকসানও কমবে। এ পদ্ধতি অবলম্বন করলে চালের উৎপাদন খরচ কম হবে এবং ভোক্তারাও অধিক সাশ্রয়ী মূল্যে চাল পাবেন, বলেন তিনি।
