ক
ঘনবন বেষ্টিত ভাওয়াল রাজ্য। সেই রাজ্যের রাজা কালীনারায়ণ রায়চৌধুরী। প্রজাহিতৈষী এই রাজার রাজধানী চিলাইনদীর পাশে জয়দেবপুরে। বর্তমানে তা গাজীপুরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। ১৮৫৫ সালের ১৬ জানুয়ারি এই জয়দেবপুরেই রামনাথ দাসের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন গোবিন্দদাস। রামনাথের দরিদ্র পরিবার। সেই পরিবারের উপর রাজপরিবারের ছিলো সুনজর। রাণী সত্যভামা দেবী গোবিন্দদাসকে সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। নিজ সন্তান কুমার রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়ের সাথে থেকে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেন। রাজকন্যা কৃপাময়ী দেবী গোবিন্দদাসকে ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। কবি সেই সুখস্মৃতি স্মরণে “প্রেম ও ফুল” কাব্যগ্রন্থের ‘শ্রীশ্রীমতী কৃপাময়ী দেবী’ কবিতায় লিখেছেন :
“আজিও কি আছে মনে ভোল নি ভগিনি!
দুইজন এক সাথে, লিখেছি কলার পাতে,
হাতে ধরি শিখায়েছ আদরে আপনি!
কেবল তোমার স্নেহ, আজো প্রাণ আছে দেহে,
কৃপাময়ি করুণার তুমি নির্ঝরিণী।”
রাজার বৃত্তিতে ঢাকার নর্মাল স্কুলে লেখাপড়া করেন গোবিন্দদাস। নর্মাল স্কুল থেকে এসে রাজার সহায়তায় বঙ্গ বিদ্যালয়ে প্রধান পণ্ডিত নিযুক্ত হন। বঙ্গ বিদ্যালয়ে কিছুদিন প্রধান পণ্ডিতের দায়িত্ব পালন করে রাণী সত্যভামা দেবীর অর্থ সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন। তবে এখানেও বেশিদিন পড়ালেখা করেননি। শেষে রাজা কালীনারায়ণ রায় উনার সন্তান রাজকুমার রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়ের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে নিযুক্ত করান। পিতৃসম রাজা কালীনারায়ণ রায়ের স্মরণে কবি তাঁর “ফুলরেণু” কাব্যগ্রন্থের ‘রাজা কালীনারায়ণ রায়’ কবিতায় লিখেছেন :
“কোথা গেলে মহারাজ কালীনারায়ণ,
ছাড়িয়া ভাওয়াল তব প্রিয় জন্মভূমি?
যাহার সেবায় আহা অর্পিলে জীবন,
দেখ আজ সে ভাওয়াল চিন কি না তুমি!”
গোবিন্দদাস দরিদ্র পরিবারে জন্মালেও মেধা ও মননে অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন কাব্যসাহিত্যে। মননশীল জীবনের জন্য পেয়েছিলেন জমিদারদের সাহচর্য। তবে প্রতিবাদ করতে ভুলেননি সকল অনিয়ম, অত্যাচারের।
খ
গজারি বন বেষ্টিত অরণ্যভূমি ভাওয়ালের মাটিতে গোবিন্দচন্দ্র দাস জন্মালেও রবীন্দ্রযুগে কাব্যে রেখেছেন নিজস্বতার উজ্জ্বল চিহ্ন। উনার প্রশংসায় প্রমথনাথ বিশী’র মূল্যায়ন, ‘অনেক প্রখ্যাতনামা কবি বঙ্গবাণীর বীণাযন্ত্রের পুরাতন তন্ত্রীটি বাজাইয়াই যখন সন্তুষ্ট হইয়াছেন, তখন পুরাতনে সন্তুষ্ট না থাকিয়া গোবিন্দ দাস পুরাতন যন্ত্রে নতুন তন্ত্রী আরোপ করিয়া নূতনতর সুর ধ্বনিত করিয়াছেন- তার কমে তাঁহার কবিপ্রকৃতি সন্তুষ্ট হইতে পারে নাই।’ সত্যিই কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস পুরনো যন্ত্রে নতুন তন্ত্রী আরোপ করে নতুন সুর ধ্বনিত করেছিলেন উনার কাব্যে। অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘গোবিন্দচন্দ্র দাসের কবিতা ঊনবিংশ শতাব্দের শেষপাদে ও বিংশ শতকের প্রথম দু-দশকে বাংলা কাব্যনদীতে নতুন স্রোত সঞ্চার করেছিল, তা অবশ্য-স্বীকার্য।’ এই নতুন স্রোত কাব্যে আনতে পারলেও উনার জীবন কেটেছে আলোআঁধারিতে। কবির এই আলোআঁধারি জীবনকে স্মরণে অসীম বিভাকর লিখেছেন, ‘গোবিন্দচন্দ্র দাসের জীবন যেন এই নিয়মের অনুবর্তী নয়। তাঁর আলো মানে বৈপরীত্যের নিরবচ্ছিন্ন আঘাতে টুকরো কাঁচের ছড়িয়ে থাকা অবশেষ।’ তবুও সেই আলো আসেনি আলোচনার আলোতে। উনার সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়ন যতটুকু হওয়ার কথা ততটুকু হয়নি কষ্ট নিয়েই তা বলতে হয়। জীবৎকালে উনার দশটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়ে গেছে অগ্রন্থিত অনেক কবিতা। কলকাতার মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রো: লি: থেকে অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় গোবিন্দচন্দ্র দাসের কাব্যগ্রন্থ ও অগ্রন্থিত কবিতা নিয়ে প্রায় অর্ধশত বছর আগে প্রকাশ করেন “কাব্যসম্ভার”। কবি গোবিন্দদাসের কাব্য নিয়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি করেন ড. মণ্টুকুমার মিত্র। বাংলাদেশ থেকে পি.এইচ.ডি করেন ড. আলী হোসেন। তবে এখনো বাংলাদেশ থেকে কবির সমস্ত সৃষ্টিকর্ম মলাটবদ্ধ হয়নি।
গ
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাসের জন্মদিন স্মরণে কবির প্রতি বিনম্র শুভেচ্ছাঞ্জলি। এই জন্মদিনে প্রত্যাশা ভুলে যাওয়া এই নক্ষত্র : ভাওয়ালের কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস আবার উজ্জ্বলতর হবে কাব্যালোচনায়।
