ভাষা-শহীদ রফিকের রক্তাক্ত মৃতদেহ বেদনাহত করলো ঊনিশ-কুড়ি বছরের যুবককে,এবং ভাষা ও দেশপ্রেমচেতনা তাঁকে এতোটাই আলোড়িত করলো যে বেদনায় লীন হয়ে তিনি লিখলেন,’ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি’।
এই একটি কবিতা বা গীতিকবিতা অথবা গণসঙ্গীত লেখার পর আব্দুল গাফফার চৌধুরী আর কিছু না লিখলেও তাঁর অমরত্ব সম্ভবত নিশ্চিতই ছিল।
এক্ষেত্রে আমরা তো বটেই স্বয়ং গাফফার সাহেবও সবিশেষ ঋণী কালোত্তীর্ণ সুরস্রষ্টা আলতাফ মাহমুদের কাছে।
আব্দুল লতিফ সাহেব নয়, আলতাফ মাহমুদের সুরারোপিত গানটি আমরা যখন কন্ঠে তুলে নিতাম আমাদের ছেলেবেলায় প্রভাত ফেরিতে, এবং আগের দিনের বিকেলে নিজের বাগান বা অন্যের বাগান থেকে চুরি করা ফুল হাতে নিয়ে ধীরলয়ে যখন হেঁটে যেতাম শহীদ মিনারের দিকে, মনে হতো এখানে এই আলোর মিছিলে মিশে গেছেন সবার অলক্ষ্যে রফিক, জব্বার, বরকত,সালাম, শফিউর, আউয়াল ও অহিউল্লাহ প্রমুখ।
সম্ভবত দেশপ্রেমচেতনার ভ্রুণ তখনই, ছেলেবেলার সেই প্রভাত ফেরিতে সত্তার জমিনে প্রথম অঙ্কুরিত হতে শুরু ক’রে।
পরিণত বয়সে এসে যখন ক্ষণজন্মা জহির রায়হান এর ধ্রুপদী সৃষ্টি ‘জীবন থেকে নেওয়া’র বিশেষ একটি দৃশ্যপটে প্রভাত ফেরিতে গানটি গীত হতে দেখি, বুকের ভেতরের রক্তের নহর, এবং চোখের জলে জ্বলতে থাকা আগুন ঘোষণা করতে থাকে ছেলেবেলার প্রভাত ফেরির মহিমা। আমরা তখন হয়ে যাই অন্যরকম মানুষ, প্রকৃত মানুষ, মহত্তম মানুষ।
জীবনের এই মধ্যাহ্নে এসে মনে হয়, প্রভাত ফেরির জন্য আমাদের শৈশবে-কৈশোরে ফুল চুরি করা মুহূর্তের মতো সুন্দর,নান্দনিক ও পবিত্র ক্ষণ জীবনে অল্পই এসেছে।
গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ুক বাঙলা ভাষার মহিমা; ভাষা শহীদগণ জান্নাতের সৌন্দর্য বর্ধনে বিশেষ অনুষঙ্গ হয়ে উঠুন,প্রার্থনা।
শাহান সাহাবুদ্দিন : কবি,লেখক ও প্রাবন্ধিক; সম্পাদক, নিত্যবেলা
