ঢাকাশুক্রবার , ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য
বিজ্ঞপ্তি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফাঁস হয়ে যাচ্ছে আপনার মুঠোফোনের ছবি, ভিডিও, অডিও রেকর্ড?

লেখকঃ মনজুর আলম
অক্টোবর ৮, ২০২৪ ৫:৫৫ অপরাহ্ণ
link Copied

 

 

দেয়ালেরও কান আছে এই প্রবাদ বাক্যের মতো আসলেই আমাদের মুঠোফোনের আছে বিশেষ কান, সেই কানে আড়ি পেতে সব শুনতে পায়, দেখতে পায় তার ক্যামেরার চোখ দিয়ে।

স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট এখন সবার নিত্য প্রয়োজনীয় মৌলিক অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের শুমারী অনুসারে শতকরা ৯৭.৯ ভাগ মোবাইল ব্যাবহারকারী জনসংখ্যার ৬৩.৩ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যাবহারকারী।

এই অতীব প্রয়োজনীয় যন্ত্রটি কখনো কখনো হয়ে উঠে যন্ত্রণার কারণ। আপনার হাতে থাকা মুঠোফোন দখলে চলে যেতে পারে অন্য কারো নিয়ন্ত্রণে। হারিয়ে বসতে পারেন আপনার গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যাক্তিগত ছবি, ম্যাসেজ, ভিডিও এবং কল রেকর্ড। আপনার বন্ধুর মত আগলে থাকা যন্ত্রটির আচরণ তখন হয়ে যাবে চিরশত্রুর মত ।
বিশেষ কোনো গোষ্ঠী, রাষ্ট্রীয় গোয়ান্দা সংস্থা বা কোনো স্বৈরাচারী সরকারের গোপন নজরদারীর আওতায় যদি আপনি পড়েন তাহলে ভার্চুয়াল গোয়েন্দার মত ওত পেতে হাতিয়ে নিতে পারে আপনার মুঠোফোনের সকল তথ্য। আপনার লোকেশন থেকে শুরু করে হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জারের বার্তা বা অডিও কল কোন কিছুই বাদ যাবে না চুরি থেকে।

পেগাসাস কী?

পেগাসাস একটি শক্তিশালী স্পাইওয়্যার, যা ইসরায়েলি সংস্থা এনএসও গ্রুপ তৈরি করেছে। এটি প্রাথমিকভাবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং গুরুতর অপরাধ তদন্তে সহায়তা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। তবে, গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রশাসন এই পেগাসাস ব্যবহার করে কান পেতেছে তার সমালোচক থেকে শুরু করে শত্রু–বন্ধু অনেকের ব্যক্তি জীবনে। ‘পেগাসাস’ ব্যবহার করে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, বিরোধী মতাবলম্বী এমনকি কোনো দেশের ক্ষমতাসীন পরিবারের সদস্যদের ওপরও আড়িপাতা হয়েছে। আড়িপাতার তালিকা থেকে বাদ যায়নি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, অ্যাকাডেমিক, এনজিও কর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরাও।

এই স্পাইওয়্যারটি অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির, যা ব্যবহারকারীকর অজান্তেই ‘শূন্য ক্লিকে’ ফোনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে ফোনের মাইক্রোফোন, ক্যামেরা, মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন এবং এমনকি এনক্রিপ্টেড ডেটাতেও অ্যাক্সেস পাওয়া যায়। পেগাসাস আপনার কথোপকথন রেকর্ড করতে আপনার ফোনের মাইক্রোফোনটিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় করতে পারে। আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন সব এই স্পাইওয়্যার নজরদারিতে রাখে।

সরকারি সংস্থাগুলোকে সন্ত্রাসবাদ ও অপরাধ প্রতিরোধে এবং তদন্তে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ জীবন বাঁচাতে সহায়তা করবে, এনএসও গ্রুপ এমন যুক্তি দিয়ে বৈধতার লাইসেন্স পায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা: একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ

পেগাসাস কেলেঙ্কারি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে, ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা কতটা চ্যালেঞ্জিং। গোপনীয়তা একটি মৌলিক মানবাধিকার, যা ডিজিটাল যুগে হুমকির মুখে পড়েছে। এ কারণে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার জন্য সরকার, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং সাধারণ মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে। সরকারকে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ইএসএস লিমিটেড এর কর্ণধার পার্থ সারথী বিশ্বাস বলেন, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি যেমন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বেড়েছে তেমনি ব্যাক্তিগত তথ্য চুরির ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এর প্রতিরোধে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসলেও, এই ধরনের নজরদারি স্পাইওয়্যারের রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ ব্যাবহারের জন্য এসব স্পাইওয়্যারকে ভাইরাস হিসেবে দেখা হয় না।
কীভাবে আমাদের সাইবার নিরাপত্তা রক্ষা করা যায়?
সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত ডিভাইস ও অ্যাকাউন্টগুলোতে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা, অজানা লিঙ্ক ও ফাইল থেকে দূরে থাকা, এবং দুই-স্তরের নিরাপত্তা (টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন) সক্রিয় করা একটি ভালো ব্যাবস্থা হতে পারে। এছাড়াও, নির্ভরযোগ্য সাইবার নিরাপত্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষা করা উচিত।

বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যক্তি ও সংস্থাগুলিকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে এবং নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নিম্নলিখিত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবেঃ
১। আপনার ডিভাইসে অস্বাভাবিক আচরণ খেয়াল করুন, ব্যাটারি দ্রুত নিঃশেষ হচ্ছে কি না। স্টকাওয়্যার আপনার অজান্তে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে বলেই হয়তো এমনটা হচ্ছে।
২। ডিভাইসটি বিশ্বস্ত স্পাইওয়্যার ডিটেক্টর দিয়ে স্ক্যান করুন।
৩। ডিভাইসে থাকা প্রতিটি অ্যাপ লক্ষ করুন। এমন কিছু কি আছে, যা আপনি ইনস্টল করেননি। সন্দেহজনক মনে হলে ডিলিটের আগে ভেবে নিন। এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় অভিযোগ জানাতে চাইলে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
৪। অনলাইনে নিজের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট সেটিংসে গিয়ে দেখুন সেগুলো থেকে আপনার ডিভাইসে থাকা কোন কোন অ্যাপ তথ্য নিচ্ছে। সন্দেহজনক কিছু পেলে সেগুলো চিহ্নিত করুন।
৫। সন্দেহজনক মনে হলে ফ্যাক্টরি রিষ্টোর করে নতুনভাবে ফোন ব্যাবহার শুরু করুন, তার আগে অবশ্যই আপনার গুরুত্বপূর্ণ ডাটা ব্যাকআপ নিয়ে রাখুন।
৬। এন্ড্রয়েড এবং আইফোনের ভার্সন সবসময় আপডেট সংস্করণ ব্যাবহার করুন।
৭। আইফোনের ব্যাবহারকারীরা সেটিংস এর জেনারেল মেনু থেকে “iTunes Wi-Fi Sync” নিষ্ক্রিয় রাখুন।

পরিশেষ
পেগাসাস কেলেঙ্কারি একটি উদাহরণ হিসেবে দেখায় যে কিভাবে সাইবার অপরাধ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন সমগ্র বিশ্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে। আমাদের সকলের উচিত আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হওয়া। সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন কেবল প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের কাজ নয়, বরং প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।
বিশ্ব একটি নতুন ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে সাইবার নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা রক্ষা আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই সময় আমাদের সাইবার নিরাপত্তার ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার, যাতে ভবিষ্যতে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারি।

লেখকঃ মনজুর আলম, ডাটা সেন্টার ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ
monzu.it@gmail.com