আমি আশাবাদি মানুষ। নির্মাণ আর অঙ্গিকার আমার প্রধাণতম সম্পদ। সেক্ষেত্রে আজ যখন বসন্ত দুয়ারে আমি লোপাদি’র কন্ঠ ছাপিয়ে শুনতে পাচ্ছি-
‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান,
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান।
আমার আপন হারা প্রাণ
আমার বাধন ছেঁড়া প্রাণ
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান,
ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান।’
এটাতো প্রেমের জন্য সমর্পিত হওয়ার গান, নিবেদিত হওয়ার গান। এই নিবেদনটা ভালো, আপনাকে হারিয়ে পাগলপারা অবস্থাটা ভালো।
একটা সময় ছিলো যখন সব কিছুতেই ভালো লাগা ছিলো, ছিলো সৌন্দর্য খোঁজার প্রবণতা। সেই সময়টা এখন নেই বা হারিয়ে ফেলেছি তা নয়। এই সময়ে এই বিয়াল্লিশে এসে দেখবার চোখ ভিন্ন মাত্রায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ঋদ্ধ হয়েছে কিনা জানি না।
সম্ভবত ২০০১ সালের দিকে, আমরা যারা নিবেদিত প্রাণ বা হরিহর আত্মা ছিলাম, ছিলাম সুখে-দুখে একসঙ্গে বন্ধুত্বের আকাশ মাথায় নিয়ে। সেই আমরা, দেলোয়ার টিপু শহীদ লিটন আর ও কেউ কেউ চলে গেছি কুমিল্লার বার্ডে। ওখানে শুধু পাহাড় আর সেগুনের সৌন্দর্য দেখবো এমন না। এর পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের সমাধি দেখা বা অনেকটা প্ল্যানচেটে আত্মা এনে তাদের সঙ্গে কথা বলা, হিটলার মুসোলিনির খোঁজ নেয়া- তাতো আছেই। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে আসলে তখন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার যে নীলনকশা প্রথম করেছিলেন মাহবুব আলম চাষিরা, মোশতাকরা, সেই জায়গাটি দেখা। তখনই আমরা জেনে গিয়েছিলাম আমাদের গুরু মহাত্মা আহমদ ছফা থেকে, এখানে বসে মোশতাক কুকুরেরা, চাষি কুকুরেরা কি সর্বনাশের চিন্তায় ব্যস্ত ছিল!
বার্ডে ঢুকে মনে পড়ল আজ বসন্ত! আরে বলে কী! কী করি এখন? কি করি মানে? তখন এমন একটা সময় ছিল প্রাপ্তির জীবনে থেকেও হারানো হারানো ব্যাপার ভালো লাগতো। কল্পনা করে নিতাম, একটা তুমুল প্রেমে আছি। প্রেমের নন্দনকাননে হাঁটছি। কিন্তু প্রেমটা বেশিদিন টিকলো না। প্রেমিকা হয়েছে আকাশের ওপারে আকাশ। তারপর আমরা হয়ে গেলাম অন্যরকম মানুষ। যে মানুষ রেল লাইনের স্লিপার মাড়িয়ে পাথর ছুঁড়ে দিয়ে শূন্যের দিকে দিগন্তের দিকে চলে যাচ্ছে সিগারেট ফুঁকে দুরে কোথাও। ঘরে ফেরার তাগাদা নেই। গালে বহুদিনের শেভ না হওয়া দাড়ি বেদনার নামতা জপছে তখন!
বার্ডের সেই যৌবনা দুপুরে হঠাৎ মনে হলো আমার এক বন্ধুকে চিঠি লেখা দরকার। তখন তো ফেসবুক ছিলো না, টেক্সট, চেট টেট ছিলো না। আমি হতদরিদ্র ছিলাম বলে, সেই ২০০১ সালে মোবাইলফোনও ছিলো না আমার। ফলে চিঠি লিখবো সিদ্ধান্ত নিলাম। বসন্ত বলে কথা! প্যাড সাথে থাকার কথা। কিন্তু আমি অভিনব লেখার জমিন আবিষ্কার করলাম। আর তা হলো টিস্যু! আমি টিস্যুতে তাকে আগ পিছ না ভেবে ‘পদাতিকের’ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই কটি পঙক্তি লিখে বসন্তের শুভেচ্ছা জানিয়ে দিলাম। পঙক্তিগুলো হলো-
‘আজ হোকনা রং ফ্যাকাসে
তোমার আমার আকাশে,
চাঁদের হাসি যতই হোকনা ক্লান্ত..
বৃষ্টি নামুক নাইবা নামুক,
ঝড় উঠুক নাইবা উঠুক,
ফুল ফুটুক নাইবা ফুটুক,
আজ বসন্ত..’
তারপর ২০১৩ সালে এসে এক বসন্তে, সম্ভবত বসন্তেই, কী যেনো ভেবে লিখে ফেললাম-
‘নিরঙ্কুশ প্রেমের নন্দনকাননে ফুটেছে চন্দ্রমল্লিকা
রমণীয় লাবণ্যের বিভায় তুমি নিজেই যেন পুষ্প বিন্যাস;
কবিতার রাজধানী শাহবাগে আজ বিকেলে যেই
দাঁড়ালে তুমি-
স্বর্ণাভ চন্দ্রমল্লিকার দোকানীরা লজ্জা পেলো তখনি!’
এইযে পজেটিভ চিন্তা মানসপ্রেম নিয়ে। এমনকি নিজের ভেতর তুমুল বসন্ত নিয়ে। এসব আমাকে আলোড়িত করত। ফাগুনের আগুনের উত্তাপ টের পেতাম। দখিণা বাতাসের পরশ বলত অন্যরকম জীবনের কথা। যে জীবন নির্মাণের। সৃষ্টির। অভিনব উদ্ভাসনের। তারপর সংসারী হলাম। ঘরে, জীবনে জান্নাত এলো, তারপর শ্রেষ্ঠ বসন্ত আবরার গল্প, গল্প আব্বু আমাদের জীবনে এলো। সেই সঙ্গে মানসপ্রেম, নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের তারুণ্যের সময়ের প্রেম। অবচেতনে বিপুলকল্পনা বিস্তারি হেলেন ভেনাস বনলতাসেন নন্দিনী প্লাবন- তারা তো ইমাজেনিটিভ জায়গাজমিনে আছেই, আছে তুমুল বসন্ত ভেতরে বাইরে। সৃজনের মননের ফুল হয়ে ফুটছে। এইসব ফুলের নাম তো পলাশ শিমুল চন্দ্রমল্লিকা বা কৃষ্ণচূড়া না। এটা অনামিকা, শিল্পীর ফুল- বেদনার ফুল, নির্মাণের ফুল- সৃষ্টির নন্দন কাননে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুটে থাকা দৈবফুল। এই ফুলের সৌন্দর্য দেখে কেবল দৈবসত্তা- তিনি শিল্পী, ভাবুক, ঋষি, কবি-এছাড়া আর কে দেখে? আর কেউ না, না বৈষয়িক লোক, না মওলানা!
এত প্রেমে থেকে এক সত্তা যখন রবি ঠাকুরকে ডাকেন, ডাকতে থাকেন; ডেকে আনেন শিলাইদহ কুঠিবাড়ি আঙ্গিনা থেকে নিজের গহনে, এবং গান ধরেন বসন্তের বাগান আকাশ হাওয়াকে জানান দিয়ে-
‘ও আমার চাঁদের আলো,
আজ ফাগুনের সন্ধ্যাকালে
ধরা দিয়েছ যে আমার
পাতায় পাতায় ডালে ডালে।
যে-গান তোমার সুরের ধারায়
বন্যা জাগায় তারায় তারায়,
মোর আঙিনায় বাজল সে-সুর
আমার প্রাণের তালে তালে।’
ঠিক তখন মনস্তত্ত্বের দান্ধিক জটিলতাকে সামনে রেখে অন্যসত্তা তপন চৌধুরীর কন্ঠে বলে ওঠে-
‘পলাশ ফুটেছে শিমুল ফুটেছে এসেছে দারুণ মাস
আমি জেনে গেছি তুমি আসিবে না ফিরে মিটিবেনা পিয়াস
সুখের বাতাস বহেনা এখন হৃদয়ে দীর্ঘশ্বাস
আমি জেনে গেছি তুমি আসিবে না ফিরে মিটিবেনা পিয়াস
পলাশ ফুটেছে শিমুল ফুটেছে এসেছে দারুণ মাস…’
দান্ধিক সহাবস্থানে তখন আমরা এই বসন্তে হয়ে যাই অন্যরকম মানুষ, যে মানুষগুলো স্বপ্নগ্রস্থ- পাগলপারা। তখন কবি আবুল হাসানের এই কথাগুলো বরং বিপাকে ফেলে দেয়, ফেলে দেয় দ্বন্দ্বে এবং দ্বিধায়:
‘যতদূর থাকো ফের দেখা হবে।
কেননা মানুষ যদিও বিরহকামী,
কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।
মিলে যায়_ পৃথিবী আকাশ আলো একদিন মেলে!’
লেখক: শাহান সাহাবু্দ্দিন : কবি,গল্পকার ও প্রাবন্ধিক; সম্পাদক, নিত্যবেলা
