ঢাকামঙ্গলবার , ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য
বিজ্ঞপ্তি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সম্পাদকীয়

বিদায়, প্রতিভার আগুনফুল আবুবকর সিদ্দিক, বিদায়!

শাহান সাহাবুদ্দিন
ডিসেম্বর ২৮, ২০২৩ ৪:৫০ অপরাহ্ণ
link Copied

 

চ’লে গেলেন বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও গীতিকার আবুবকর সিদ্দিক। ৮৭ বছর আয়ু পেয়েছিলেন তিনি। গতোকয়েকবছর খুলননায় বোনের বাড়িতে ছিলেন নিভৃতে। শরীরের সঙ্গে, বেদনার সঙ্গে লড়াই করে শেষ ক’বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। লেখালেখি থেকেও এসময় অনেকটা দূরে ছিলেন। সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ তরুণ কথাসাহিত্যিক আমার অগ্রজপ্রতিম বন্ধু স্বকৃত নোমান-এর সূত্রে কবি ও বহুমাত্রিক লেখক আবুবকর সিদ্দিক-এর সঙ্গে আমার বিশেষ পরিচয় ঘটেছিল। আমার জন্য এটা সৌভাগ্যই ছিল বটে। রোদেলা থেকে প্রথম প্রকাশিত আমার গল্পগ্রন্থ ‘আত্মহত্যার আগে’র মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন তিনি। ২০১১ সনের বইমেলায়। নজরুল মঞ্চে। তখন তিনি সাভার ব্যাংকটাউন আবাসিক এলাকায় থাকতেন। স্বকৃত নোমান ভাইয়ের সঙ্গে আগেই কথা হয়েছিল আবুবকর সিদ্দিক সাহেবকে তাঁর সাভারের বাসা থেকে বই মেলায় নিয়ে যেতে হবে। নোমান ভাইও সঙ্গে থাকবেন৷ তাঁর বাসায় নির্ধারিত সময়ের দুঘন্টা পর গেলাম। এরমধ্যে বারবার ফোন দিচ্ছেলেন। গিয়ে দেখি প্রস্তুত হয়ে তিনি ঝুলবারান্দায় ব’সে আছেন। দেরি হওয়ায় যারপরনাই বিরক্ত ছিলেন। পরে নজরুল মঞ্চে তিনি বললেন সৃষ্টি দিয়ে শাহান আমার দুঘন্টার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে না পারলে তাকে ক্ষমা করবো না। ক্ষমার যোগ্য এখনও আমি হইনি। অনুষ্ঠানপর্ব শেষে বইমেলা হয়ে আমরা মাইক্রোযোগে ফিরছিলাম। সঙ্গে আবুবকর সিদ্দিক সাহেব, নোমান ভাই ও অন্যরা। মিরপুরের দশ নম্বরে আমার কাজিন জেসমিনের শ্বশুরবাড়ি আপ্যায়িত হয়েছিলাম। সিদ্দিক সাহেব জেসমিনের রান্নার খুব তারিফ করেছিলেন। এত বড় লেখককে কাছে পেয়ে জেসমিনের শ্বশুরবাড়ির লোকজন বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন, সম্মানিত বোধ করেছেন। সেসময় কবি শক্তি চট্রোপাধ্যায়, আবুল হাসান- সুরাইয়া খানম, কন্যা বিদিশা, বিদিশাপতি এরশাদ এঁদের নিয়ে গভীর আলোচনা করেছিলেন আমার সঙ্গে। কথাপ্রসঙ্গে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনও উঠে এসেছিল। খুবই স্পর্শকাতর বিষয় ছিল সেসব। এও বলে রেখেছিলেন এসব যেন আমি কাউকে না বলি এবং না লিখি। আমি আমার কথা রেখেছি৷ অদ্যবধি এ বিষয়ে কোথাও মুখ খুলিনি। লিখিনি। খুলনার একটি হাসপাতালে আজ ভোরে তাঁর চ’লে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে ঘুরে ফিরে মনে হচ্ছিল পারিবারিক ও সংসারধর্মে তিনি অনেকটা জীবনানন্দের জীবনের ভাবানুবাদ ছিলেন। ভেতরে-গহনে।

অন্যদিকে চলনে-বলনে, ভরাট কন্ঠস্বর, স্টাইল, পোশাক-পরিচ্ছদ ও ব্যাকব্রাশ চুলে দৃশ্যত তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পরে সাহিত্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কল্লোল যুগের অন্যতম লেখক

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের মতো। অভিজাত।

 

বাইরে থেকে দেখে কী বোঝার উপায় আছে ভেতরে ভেতরে সংবেদনশীল হৃদয়, চূড়ান্ত শিল্পী-মনিষা কতোটা ক্ষয়ে যেতে পারেন, কতোটা ক্লান্ত হতে পারেন, কতোটা জখম হতে পারে হৃৎপিণ্ডের নরোম জমিন! বোঝার উপায় নেই। কবি ও বহুমাত্রিক লেখক আবুবকর সিদ্দিককে দেখেও তা বোঝা যেতো না। কেবল কাছের মানুষেরাই টের পেয়েছিলেন তাঁর ভেতরের চাতকের আর্তনাদ! শেষ জীবনে শিশুর মতো কোমল হৃদয় মুক্তিসংগ্রামের আগুনঝরা দিনে লিখেছিলেন:

‘বেরিকেড বেয়নেট বেড়াজাল /পাকে পাকে তড়পায় সমকাল’।

 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ফুটিয়েছিলেন তিনি এই আগুনফুল।

 

কবি ও বহুমাত্রিক শিল্পের প্রতিভূ আবুবকর সিদ্দিক এর বিপুলা সৃষ্টির উল্লেখযোগ্য ফসল:

 

কাব্যগ্রন্থ: ধবল দুধের স্বরগ্রাম (১৯৬৯), বিনিদ্র কালের ভেলা (১৯৭৬), হে লোকসভ্যতা (১৯৮৪), মানুষ তোমার বিক্ষত দিন (১৯৮৬), হেমন্তের সোনালতা (১৯৮৮), নিজস্ব এই মাতৃভাষায় (১৩৯৭), কালো কালো মেহনতী পাখি (২০০০), কংকালে অলংকার দিয়ো (২০০১), শ্যামল যাযাবর (২০০০), মানব হাড়ের হিম ও বিদ্যুৎ (২০০২), মনীষাকে ডেকে ডেকে (২০০২), আমার যত রক্তফোঁটা (২০০২), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০২), কবিতা কোব্রামালা (২০০৫), বৃষ্টির কথা বলি বীজের কথা বলি (২০০৬), এইসব ভ্রুণশস্য (২০০৭), বাভী (২০০৮), নদীহারা মানুষের কথা (২০০৮) ইত্যাদি এবং ছড়াগ্রন্থ: হট্টমালা (২০০১)। এসব কাব্যরচনার পাশাপাশি তিনি ক্রমাগত নির্মাণ করেন অবিনাশী গণসংগীত, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও জীবনীগ্রন্থ। তার প্রথম গ্রন্থ ধবল দুধের স্বরগ্রাম। তার একটি মাত্র ছড়াগ্রন্থ হট্টমালা (২০০১)।

 

গল্পগ্রন্থ: ভূমিহীন দেশ (১৯৮৫), চরবিনাশকাল (১৯৮৭), মরে বাঁচার স্বাধীনতা (১৯৮৭), কুয়ো থেকে বেরিয়ে (১৯৯৪) এবং ছায়াপ্রধান অঘ্রান (২০০০)।

 

মহান মুক্তিযুদ্ধ, পূর্বাপর, কালাকাল ইত্যাদি বিষয়কে উপজীব্য করে লেখা মরে বাঁচার স্বাধীনতা (১৯৮৭) গল্পগ্রন্থ মুক্তিযুদ্ধের বিশুদ্ধ শিল্পদলিল হিসেবে সমধিক স্বীকৃত। এ ছাড়াও ‘বেলুনওয়ালা’, ‘খালখসা লাল কংকাল’, ‘ভূতপ্যাদানী’, ‘খাদ্য মন্ত্রণালয় কতো দূরে’, ‘চন্দনের ঘূণ’, ‘লাশের নাম নেই’, ‘খতম’, ‘এই সেই জয় বাংলা’, ‘ফজরালি হেঁটে যায়’, ‘রক্তগর্জন’ ও ‘খোঁড়া সমাজ’ অগ্নিকাল নিয়ে ইত্যাদি তাঁর কালোত্তীর্ণ গল্পসুষমা।

 

মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্পগ্রন্থ: মুক্তিলাল অভ্যুদয় (২০০৮), মধুবন্তী (২০০৯) এবং বরীনভূমি-বাদাবন (২০১৭)।

 

তাঁর প্রকাশিত উপন্যাস চারটি: দক্ষিণবঙ্গের জনজীবন নিয়ে লেখা ‘জলরাক্ষস’ (১৯৮৫, দ্বি. প্র. ২০০১), উত্তরবঙ্গের খরাপীড়নের ভয়াবহ শিল্পনির্মাণ ‘খরাদাহ ‘(১৯৮৭, দ্বি. প্র. ২০০০), স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের পটভূমিতে রচিত ‘বারুদপোড়া প্রহর’ (১৯৯৬) এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের আলেখ্য ‘একাত্তরের হৃদয়ভস্ম’ (১৯৯৭)।

 

তার প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ কালের কলস্বর (২০০১) ও সাহিত্যের সংগপ্রসংগ (২০০১)।

 

জীবনীগ্রন্থ রমেশচন্দ্র সেন (১৯৯২)।

 

স্মৃতিকথা:সাতদিনের সুলতান (২০০২), প্রীতিময় স্মৃতিময় (২০১০)।

 

তাঁর অর্জন:

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), বাংলাদেশ কথাশিল্পী সংসদ পুরস্কার, বঙ্গভাষা সংস্কৃতি প্রচার সমিতি পুরস্কার (কলকাতা), খুলনা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, বাগেরহাট ফাউন্ডেশন পুরস্কার, ঋষিজ পদকসহ দেশি-বিদেশি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।

 

এত বড় শিল্পিপ্রতিভা এদেশে যোগ্য স্বীকৃতি জীবদ্দশায় পেলেন না। না পেলেন তিনি একুশে পদক, না পেলেন স্বাধীনতা পদক। এতে তাঁর কিছু যায় আসে না। লিও তলস্তয় নোবেল পেলেন না, তাতে তলস্তয় খাটো হননি, ম্লাণ হয়েছে নোবেল। এ কথা কী আবুবকর সিদ্দিক-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়? নিশ্চয়ই প্রযোজ্য।

 

এইক্ষণে প্রাসঙ্গিক ব’লেই আবুবকর সিদ্দিক সাহেবকে নিয়ে লেখা তাঁর ৮৬তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে অসামান্য কথাশিল্পী ও চিন্তক জাকির তালুকদার এর শুভেচ্ছাবার্তাটি যুক্ত করে দিচ্ছি।

— — —

আবুবকর সিদ্দিক।

অমন তীক্ষ্ণ আগুনছোটানো গদ্য তাঁর সমকালে আর কারোই ছিল না। এমনকি হাসান আজিজুল হকেরও। ছিল না বলছি কারণ তিনি এখন আর লিখতে পারেন না, ওদিকে হাসান চলে গেছেন অমর্ত্যলোকে।

জীবনকে একেবারে চামড়া-ছেলা জীবন্ত মোরগের মতো দগদগে ভাবে উপস্থিত করেছেন তিনি তাঁর সাহিত্যে।

‘খরাদাহ’, ‘মরে বাঁচার স্বাধীনতা’ তাঁর মাস্টারপিস রচনা।

কবিতা লিখেছেন, গণসঙ্গীত লিখেছেন। সেগুলোও নিজস্বতা-চিহ্নিত।

কিন্তু মানুষটি তাঁর রচনার গুণ অনুযায়ী সমানুপাতিক আলোচিত হতে পারলেন না। তাঁর অসংখ্য ছাত্র সাহিত্যের জগতে বিচরণশীল। কেউ কেউ তো তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন ঘরের মানুষের মতো। তারাও কেউ আবুবকর সিদ্দিককে নিয়ে কেন যেন নন-অ্যাকাডেমিক সৃজনশীল কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করলেন না।

জানি না ভবিষ্যতে কী হবে।

৮৬ তম জন্মদিনে তাঁকে সালাম জানাই।

*

বিদায়, শক্তিমান কবি ও বহুমাত্রিক লেখক আবুবকর সিদ্দিক। মহান স্রষ্টা আপনাকে অনন্ত শান্তিতে রাখুন।


শাহান সাহাবুদ্দিন: কবি ও লেখক; সম্পাদক, নিত্যবেলা

shahanpoet@gmail.com