‘পৃথিবীতে আর কোন রেলস্টেশন নেই বারহাট্রা ছাড়া!’
কয়েক বছর আগে হাওর এক্সপ্রেসে শেষ রাতে বারহাট্রা নেমে কথাটি বললেন কথাশিল্পী ও কবি আনিসুল হক। আমি চমকে গেলাম, বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম, এবং বললাম, কথাটি আরেকবার বলুন তো! তিনি কথাটির পুনরাবৃত্তি করলেন। বললাম, ভাই সিগারেট খাওয়া যেতে পারে, কী বলেন? নিশ্চয়ই, আনিসুল হক বললেন। আমরা সিগারেট ধরালাম। আমরা মানে কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক স্বকৃত নোমান, কবি ও কণ্ঠশিল্পী আসাদুজ্জামান রনি, এবং আমি। আনিসুল হক ভাই সিগারেটের ধোঁয়ার কুন্ডলির ভেতর জাদুবাস্তবতার আলো ছায়ার খেলা দেখতে পাচ্ছেন ব’লে মনে হলো। এবং এও মনে হলো, তিনি যতো বড় চিন্তক,দার্শনিক ও কথাকার বিপরীতে ততোটাই আনাড়ী সিগারেট টানায়। তার মানে উনি চেইন স্মোকার দূরে থাক্ স্মোকারও নন, আমার মনে হলো।
বারহাট্রা ডাকবাংলোতে কুয়াশা ঘেরা সকালটি আমরা কাটালাম। আমার নানা প্রশ্নবাণে তিনি জর্জরিত হলেন কী? না, তা মনে হলো না। বিমান বন্দর রেলস্টেশন এবং ট্রেনে আমরা আহমদ ছফা নিয়ে দীর্ঘ কথা বলেছিলাম,মনে পড়ে। আহমদ ছফা ‘মৌলবি আনিসুল হক’ ব’লে সম্বোধন করতেন তাঁকে, তিনি জানালেন। আমি বললাম, যেমন ছফা ভাইকে মৌলবি ছফা বলতেন জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক স্যার।
ডাকবাংলোর কাঁচা হলুদ রঙের সকালে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আমরা কথা বলেছিলাম সাইন্স ফিকশন নিয়ে। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা দু’চারটি বই নিয়ে তিনি এমন সব কথা বলেছিলেন যা শুনে তখন দ্বিধাদীর্ণ হলেও পরে এর সত্যতা আমি পেয়েছি।
ডাকবাংলোতে ঢোকার মুহূর্তে দেখা হল ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক মাইনুল শাহিদের সঙ্গে। মাইনুল আগের দিন এসেছিলেন। আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে তিনি ঢাকার ট্রেন ধরেন।
ডাকবাংলো ছেড়ে আমরা চলে আসি উল্টোদিকের চা-স্টলে৷ রনি ভাই বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে এমন কিছু কথা উত্থাপন করেন তাতে নোমান ভাই ও আমি বিব্রত হলেও আনিস ভাই বিব্রত না হয়ে সেসব প্রশ্নের যুক্তি খন্ডান খুব শান্ত ভাবে, এবং তিনি এক্ষেত্রেও সপ্রতিভ, আমি টের পাই।
আমরা ফের সিগারেট ধরাই। আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে-পৃথিবীতে আর কোন রেলস্টেশন নেই বারহাট্রা ছাড়া।
চমৎকৃত হতে থাকি। আলোড়িতও। মনে হয় এটাই সত্য, চূড়ান্ত সত্য। এ সত্যের পেছনে আছে দর্শন,ইতিহাস। এ সত্যের পেছনে আছে শিল্প-সত্যের অকপট ধ্রুপদী প্রকাশ। এ প্রকাশ আমাদের শক্তিমান কথাশিল্পী আনিসুল হকের পক্ষেই সম্ভব।
কে না জানে বারহাট্রা ইতিহাসের অংশ আমাদের গৌরবের ধন কবি নির্মলেন্দু গুণ এর বদৌলতে। ‘হুলিয়া’ তো শিল্প ছাপিয়ে এখন ইতিহাসের অংশ।
চা বিক্রেতা রফিজের কন্ঠস্বর কী আমরা শুনতে পাই না আমাদের সকল বিপ্লবে, মার্চের আগুনে? পাই তো! এতোটা পাই যে এই কন্ঠস্বর কিংবদন্তির অংশ করে তুলেছেন গুণ দাদা। ইতিহাস ও কিংবদন্তির মুখ যেন বারহাট্রা স্টেশন। আচ্ছা, হাওর এক্সপ্রেস এর নাম ‘কবি নির্মলেন্দু গুণ এক্সপ্রেস’ হলে কেমন হয়? সিগারেট ও চা পান করতে করতে আমি বলি। নোমান ভাই জানান, গুণ দাদা ট্রাই করেছিলেন ট্রেনটির নাম কাশবন এক্সপ্রেস করার। সরকার বাহাদুর বা আমাদের শেখের বেটি প্রস্তাবটি আমলে নেননি।
আমরা কাশবন যাই। কবির বাড়ি। কবিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলি। কাশবন গুণ দাদার দেওয়া নাম। গুণ দাদার জন্মগ্রামটির নাম আগে ছিল কাশতলা। গুণ দাদা আমাকে জানিয়েছেন কাশতলা শুনলে তাঁর মনে হতো এটি বুঝি কফতলা! পরে তিনি নাম পাল্টে দিয়ে শিল্পিত নামটি দেন। এ নামেই এখন এ গ্রামটিকে দেশ বিদেশের মানুষ চেনেন।
গুণ দাদা তখন সদ্যই লাখো ভক্তের প্রার্থনা ও ভালোবাসায় যমদূত থেকে সময় চেয়ে ফিরে এসেছেন মহান স্রষ্টার কৃপায়। কদিন আগেই ল্যাব এইডে তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে।
গুণ দাদার ছবির মতো সুন্দর টিনশেড বাড়ির আঙিনায় বসে নাস্তা সারি। এটা ওটা জানতে চাই। আনিসুল হক নোট নিতে থাকেন। তাঁর যা দরকার তা তিনি পেয়ে যান। আমি আর থামি না। দৈনিক সংবাদ জীবন, সংবাদ সম্পাদক আহমেদুল কবির (মনু মিয়া), আবুল হাসান-সুরাইয়া খানম, হুলিয়া,৬৬, ৬৯ ও শেখ মুজিব নানা প্রসঙ্গ টানি। গুণ দাদা কলের গান হয়ে বাজতে থাকেন। আমরা তন্ময় হয়ে শুনতে থাকি। নোমান ভাই তাগাদা দেন কথা শেষ করার। আনিস ভাইও।
নাস্তা সেরে আমরা চলে যাই গুণ দাদার গড়া স্বপ্নের কাশবন বিদ্যানিকেতনে। গল্প আব্বুর আম্মুমা জান্নাতকে ফোন দিই। আনিস ভাই জান্নাতকে ফোনে বলেন, ভাবী, শাহানের সঙ্গে একদিন চলে আসেন আমার বাসায় বা অফিসে। আড্ডা দেওয়া যাবে। জান্নাতের কাছে আমার ডিমান্ড বেড়ে যায়। কেননা জান্নাতের প্রিয় কথাশিল্পীদের অন্যতম হচ্ছেন আনিসুল হক। মনে মনে আনিস ভাইকে ধন্যবাদ দিই, এবং ভাবি লোকটি এতো বিনয়ী কেন! এও ভাবি গ্রেটরা তো এমনই হোন। যিনি মা, ঊষারে দুয়ারে, যারা ভোর এনেছিল, আলো-আঁধারের যাত্রী’র মতো কালোত্তীর্ণ উপন্যাস লিখেছেন তাঁকে তো বিনয়ী হতেই হয়!
আজ এই অসম্ভব রকম প্রতিভাধর বিনয়ী মানুষটির জন্মদিন। তিনি দীর্ঘজীবী হোন। প্রার্থনা!
কবি নির্মলেন্দু গুণ দাদা ও কথাশিল্পী আনিসুল হক ভাইয়ের সঙ্গে ছবিতে আমাকে দেখা যাচ্ছে। ছবি বলছে ক্রম রক্ষার বিষয়ে আমরা যথেষ্টই সচেতন। ছবিটি কাশবন বিদ্যানিকেতনে তোলা।
ছবি তুলেছেন কথাশিল্পী স্বকৃত নোমান [ভাই]। তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
লেখক: শাহান সাহাবুদ্দিন: কবি,গল্পকার ও প্রাবন্ধিক; সম্পাদক ও প্রকাশক, নিত্যবেলা।
shahanpoet@gmail.com
