তখনও জানি না পুরাকালের রাজা উদয়ন বাঁশির সুরের জাদুতে বন্যহাতিকে পোষ মানাতেন। তখনও পান্না লালের রেকর্ডের বাঁশির সুরে কি শক্তি লুকিয়ে আছে জানি না। জানি না হরিপ্রসাদের চৌরাসিয়ার বাঁশির সুর মাতাল করে তুলেছে কতটা আবেগী মানুষেদের। তখনও জানি না প্রেমিক রাজ শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরে আকুল হয়ে রাধা ছুটে আসে যমুনা পারে কুঞ্জবনে গোপন অভিসারে। সেই না জানা কৈশোরের দুরন্ত দিনে বাবার কল্যাণে কিনে ফেলেছি ভবানীপুর বাজারের বৈশাখী মেলা থেকে কোনো কালেই না বাজাতে পারা আমার প্রিয় বাঁশের বাঁশি। তারপর সারা রাত চোখে ঘুম নেই।
আঙিনার এক পাশে সজনে গাছের শিকড়ে বসে সেকি কানু সাজবার কসরত! আমার কান্ডকারখানা দেখে মায়ের সেকি হাসি। আজ যখন পরিণত বয়েসে আমি, তখনও স্বপ্ন দেখি নকশী কাঁথার মাঠের রুপাই ঢুকে পড়েছে আমার ভেতরে; তাকে ধারণ করে সন্ধ্যার পর দাবায় বসে ভাসিয়ে দিচ্ছি শূন্যের সুররাশি মহাশূন্যে। সহজ রামপ্রসাদী সুরের মূর্ছনায় গোটা গা তখন একাকার। ক্রমেই রাত বাড়তে থাকে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁশির প্রতিও সখ্য বাড়তে থাকে আমার। আমার বউ তখন তার দিকে মনোনিবেশ না করে বাঁশির প্রতি মৌন থাকার দন্ড হিসেবে এই বলে হুমকি দিচ্ছে, ‘এ বাঁশি বাজানো বন্ধ না হলে কালকের মতো হবে বলে দিচ্ছি, আজকে তাহলে সিঁদুর পরব না, কাজলও নেব না। এই যে দেখ আমি এক্ষুণি খুলে রাখছি কানের দুল। চুলও আলগা রবে, আজ আর খোঁপা বাঁধব না!’ ওদিকে জানালার ওপাশে বাঁশ ঝাড়ের মাথায় ধানের কাব্য পাঠ শেষে হেমন্তের চাঁদ অর্ধেক হেলে জ্যোৎস্নার জাল পেতে আছে।
তারপর আকস্মিক নাটকীয়তা। বাঁশিতে মাঠের চিকন সুরের খেলা জমে উঠতেই বউটি কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলছে, ‘বাঁশির সুরে আমার নাকের নোলকখানি দোলাও তো দেখি!’ তারপর বাঁশি যখন বেজে চলেছে প্রাণ কেড়ে নিয়ে তখন আমার বউ ফের বলছে, ‘আচ্ছা আমার বাহুটি নাকি সোনালি-লতার হার? এই যে ঘুরালাম বাহু, বাজাও তো দেখি এরি মতো কোনো সুর?’ এই কথা শোনার পর কোনো প্রেমিক পুরুষ কী আর থেমে থাকতে পারে? বউয়ের রাঙা ঠোঁটে বাঁশির সুর ছুঁয়ে বাহুর পরশের মতো সুমধুর সুর কলমি ফুলের বুকে ঢেউ তুলে গোটা দুনিয়াকে মাতাল করে তুলেছে তখন।
এবার বাঁশি প্রসঙ্গেই নকশী কাঁথার মাঠ ছেড়ে এই যন্ত্রটির মাহাত্ম্য তুলে ধরার জন্য রাখাল রাজগি শ্রী কৃষ্ণের সাম্রাজ্যের দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করব। ‘কাল রাতে কুঞ্জে অভিসারে যেও’। কৃষ্ণ হতে বহুল কাঙ্ক্ষিত মধুর কথা শুনে প্রেমদেবতার সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় রাধিকা যখন ললিতা বিশাখাকে বীণার তার এঁটে রাখতে বলছে, নীলাম্বরী কুচিয়ে রাখতে বলছে, ঘিয়ের বাতি ধূপ-অগুরুর গন্ধে সলতে সুগন্ধি করে জ্বালিয়ে রাখতে বলছে, টগর রজনীগন্ধা পারুল চাপা দিয়ে মালা গেঁথে রাখতে বলছে, তখন কংশকে বধ করার মধ্য দিয়ে সেই যে কৃষ্ণ মথুরার রাজা হয়ে সিংহাসনে আসীন হলেন, এদিকে যমুনা পাড়ে ব্রজধামে যে তার বিরহে কেউ একজন জ্বলেপুড়ে আঙ্গার হচ্ছেন তার কি আর খেয়াল আছে? তারপর যখন ব্রজলীলা সাঙ্গ হলো; যমুনার জল ফুলে ফেঁপে একাকার হলো রাধিকার চোখের জলে, সোনার হার মাধবী লতার উপরে পরে রইল, মল্লিকা টগর রজনীগন্ধা পারুল রাধার বিরহে শুকাতে লাগল, থেমে গেল নূপুরের রুনুঝুনু শব্দ, নিভে যেতে থাকল আরতীর দীপশিখা, কৃষ্ণ বিরহে মূর্ছা যাওয়া রাধার মূর্ছা ভাঙাবে সে বাঁশির সুর কোথায়?
তখন রাধার বিরহে কাতর বিশাখা, চিত্রা ও ললিতারা একে একে ব্রজলীলার স্মৃতি আওড়াচ্ছে। তুঙ্গদেবী বৃন্দাবনের কুঞ্জের সেই জায়গাটি খুঁজে বের করেছে যেখানে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ রাইকে নাচতে বলেছিলেন। যে নাচনে চোখের পলক পড়বে না। এত দ্রুত নাচবে রাধা যেন নীলাম্বরীর আঁচলও নড়বে না, নূপুরের শব্দ হবে না, এলোচুল উড়বে না, হাতের কাঁকন বাজবে না এবং ধনুর মতো চিহ্নিত জায়গার গন্ডি ছেড়ে যেন পা না পড়ে। যদি এমন করে নাচতে পারে রাধা তবে কৃষ্ণের বাঁশিটি সে পাবে, হেরে গেলে রাধার কাচুলি ও গলার হার কেড়ে নেবে কৃষ্ণ। …রাই সেদিন অপূর্ব নেচেছিল-অতি গতিতে মাথার চুল হতে পায়ের নূপুর পর্যন্ত সব স্থির হয়ে গিয়েছিল।
বাঁশিটি খোয়া যাওয়ার ভয়ে কৃষ্ণ তখন পালাতে ধরলে ললিতা খপ করে বাঁশিসুদ্ধ কৃষ্ণের হাত ধরে ফেলে। কৃষ্ণের চোখ তখন জলে ভরা ছলোছলো। এ দৃশ্য দেখে রাধা হাসতে হাসতে ললিতাকে বলছে, ‘ললিতা, বাঁশি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিস কেন, বাঁশি হতে ‘রাই এসো, রাই এসো’ না শুনলে কি আমি আর বাঁচব? হেরেও ওঁরই জিত।’… অথবা শরৎ বাবুর ইন্দ্রনাথের বাঁশির সুরের কথা আমরা ভুলি কি করে? রায়েদের ইন্দ্রনাথের বাঁশির সুরে শরৎ বাবুর বড়দা যখন বলেন, ‘সে হতভাগা ছাড়া এমন বাঁশিই বা বাজাবে কে, আর বনের মধ্যেই বা ঢুকবে কে (?)।’ তখন বাঁশির প্রতি সমীহের চোখে না তাকিয়ে উপায় কি?
আর কিংবদন্তির নজরুল, এস এম সুলতান, আহমদ ছফা, বারী সিদ্দিকী ও জাদুকর জুয়েল আইচ তো বংশীবাদক হিসেবে আমার কাছে বিশেষ শ্রদ্ধেয়, একই সঙ্গে আদর্শও বটে! তো বাঁশি ও বাঁশির সুরের শক্তির প্রকাশ সম্পর্কে কে-সি-ই বাহাদুর মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর যেমন সম্যক ধারণা ছিল, তেমনি আমাদেরও আছে। আর আছে বলেই যন্ত্রের জীবন ধারণের পরও স্মৃতির ক্যানভাস ধরে অবসরে কোনো এক উদাস দুপুর কিংবা শুক্লা দ্বাদশীর রাত্রি বা অমাবশ্যার গহিন আঁধারে মন ছুটে যায় আমাদের প্রত্যেকের শৈশব ও যৌবনের বিস্তৃত আঙিনায়। এইক্ষণে নজরুলের বহুল বিশ্রুত গানের বাণী শুনে নিই- ‘ফোটাও নীরস চিত্তে সরস মেঘমায়া/আনো তৃষিত নয়নে মেঘল ছায়া/বাজাও কিশোর বাঁশের বাঁশরি/ব্যাকুল বিরহেরই।’
নজরুলের বিরহের আকাশ দেখে বাঁশের বাঁশরি শুনে ব্যাকুল হতে হতে রাধারমণ পানে তাকালে কেমন হয়?
‘অ, প্ৰাণ বিশাখে ললিতে গো কহগো মরে।।
মোহন বাঁশি কে বাজায় ওগো সখী কালিন্দির তীরে।।
কেমনে চিনিল বাঁশি অভাগিনীরে।
রাধা বইলে বাজায় বাঁশি গো সুমধুর স্বরে।।
‘হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোতে’ বাঁশি কতোটা পারঙ্গম রাধার আর্তিই তা ব’লে দিচ্ছে।
এদিকে জসীম উদদীন সাহেব সেই কবে সুনিপূণভাবে চিরায়ত বাঙলার রমণীর হৃদমন্দিরের পোস্টমর্টেম ক’রে ছেড়েছেন কী নির্ভুলভাবে:
‘প্রাণ সখিরে
ঐ শোন কদম্ব তলে বংশী বাজায় কে
বংশী বাজায় কে রে সখী
বংশী বাজায় কে।
আমার মাথার বেনী বদল দেব
তারে আইনা দে।’
এখানেও বাঁশির শক্তি সহজেই অনুমেয়। বাঁশের বাঁশরিরই জয়। বংশী বাদক কতোটা আরাধ্য হ’লে মাথার বেনী বদল দিতেও আপত্তি নেই চিরকালের প্রাণ গোবিন্দ বিরহিণীর!
শাহান সাহাবুদ্দিন: কবি ও গল্পকার; সম্পাদক, নিত্যবেলা
shahanpoet@gmail.com
