হীম হাওয়ায় কাঁপছে গোটা দেশ। কুয়াশার ঘোমটা টেনে মুখ লুকিয়ে থাকে সূর্য, সকাল-দুপুর আর সন্ধ্যার পার্থক্য আটকে আছে ঘড়ির কাঁটায়। সারাদেশে শীতের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। কনকনে ঠাণ্ডায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই ঋতুর পালাবদল হয়। অনেক সময় প্রকৃতির পালা বদলের এহেন বিরুপ আচরণ অসহায় মানুষের অসহায়ত্বকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। একদিকে স্বচ্ছল মানুষের জন্য শীত আসে আনন্দ নিয়ে। পিঠা-পুলির উৎসব,ধুমায়িত চা কিংবা কফি হাতে বন্ধু-বান্ধব সাথে নিয়ে আনন্দ আড্ডায় মেতে উঠা, লেপ-কম্বলের ওমে আরাম আয়েশ করে দীর্ঘ রাত কাটিয়ে দেয়া, অন্যদিকে যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় তাদের জন্য শীত আসে ভয়াবহ দুঃসংবাদ নিয়ে। শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাদের ঠিক মতো শীতের কাপড়ও জোটে না। বিশেষ করে প্রতিবন্ধি ,শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বর্ণনাতীত। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের অনেক মানুষের প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রও নেই শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। জীবনযাত্রা কষ্টকর হয়ে পড়েছে কৃষক, দিনমজুর, ভ্যানচালক, ইজিবাইক চালক, পাথর শ্রমিক, চা শ্রমিকসহ সাধারণ কর্মজীবী এবং ছিন্নমূল মানুষের। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কাজে যোগ দিতে দুর্ভোগে পড়ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। কাজে যেতে না পারায় পরিবার- পরিজন নিয়ে সমস্যায় রয়েছেন তারা।তীব্র শীতে ভাসমান, ছিন্নমূল মানুষের কষ্টের কথা বলে শেষ করা যাবে না। হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। এ অবস্থায় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। ভাবতেই গা শিউরে উঠে এমন হাড়কাঁপানো শীতেও অনেককে খোলা আকাশের নিচে রাত্রি যাপন করতে হচ্ছে। ছিন্নমূল অসহায় মানুষ খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত মোকাবিলা করছে,তবে এ’ নিবারণ অল্প সময়ের জন্য। শীতার্ত মানুষগুলো কতটা দুর্বিষহ জীবন যাপন করে। তা আমাদের আশেপাশের ফুটপাত,রেলস্টেশনে না গেলে বোঝা মুশকিল। সকল ধর্মেই মানব সেবাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আমাদের ইসলাম ধর্মে মানব সেবাকে বলা হয়েছে সবচেয়ে বড় এবাদত।
মানবসেবাই তো পরম ধর্ম। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, “যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না”। সহ্হি মুসলিম শরীফ-২৩১৯)। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত প্রিয়নবী (দঃ) বলেছেন, “ওই ব্যক্তি পরিপূর্ণ মুমিন নয়, যে তৃপ্তি সহকারে আহার করে আর তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে”। তাই আসুন, শীতার্ত মানুষগুলোর দুর্বিষহ জীবনের কথা ভেবে তাদের পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেই। আমাদের যার যার সামর্থ অনুযায়ী তাদের জন্য গরম কাপড়ের ব্যবস্থা করি। আমাদের একটু সহায়তা লাঘব করতে পারে তাদের কষ্ট এবং দুর্বিষহ জীবনের হাহাকার। শীতার্ত মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো , মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।শীতবস্ত্রসহ খাদ্য এবং চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এজন্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শীতবস্ত্র বিতরণ, নগদ অর্থ প্রদান এবং খাদ্য ও চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সরকারের পাশাপাশি আমাদের সমাজের বিত্তবান মানুষদের এগিয়ে আসা উচিত। আসলে দান করলে বড় অংকের অর্থ দান করাটা জরুরি নয়। আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সাথে অল্প দানও অনেক সময় অনেক মূল্যবান। আমাদের অনেকের হযতো অনেক অতিরিক্ত সোয়েটার, জ্যাকেট,চাদর, কম্বল ইত্যাদি শীতবস্ত্র ঘরে পড়ে আছে, অতিরিক্ত কাপড়গুলো ঘরে জমিয়ে না রেখে শীতার্তদের মাঝে দান করে দিতে পারি। একটু উষ্ণতা দিয়ে ওদের কষ্ট লাঘবে আমরাও তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি।
হাসনা হেনা: কবি ও প্রাবন্ধিক
