ডেমো (DEMO) শব্দের বাংলা অর্থ হলো প্রদর্শন করা বা দেখানো। আরেকটু সহজ করে বিষয়টা বলছি! বিভিন্ন শপিং মলে কিংবা রাস্তার পাশে কোনো মোবাইল ফোনের দোকানে একটি কমন দৃশ্য চোখে পড়ে। দেখা যায়, শোকেসে অসংখ্য মোবাইল ফোন সাজিয়ে রাখা হয়। দেখতে হুবহু মোবাইল ফোন মনে হলেও এগুলো আসল ফোন নয়। শুধু মাত্র ক্রেতাদের দেখানোর জন্য এভাবে রাখা হয়েছে। প্রদর্শন করা হয়েছে। দেখতে দামি মোবাইল ফোনের মতো মনে হচ্ছে, অথচ এগুলো মোবাইল ফোন নয়। এগুলো বিক্রির জন্য নয়, শুধু ক্রেতা আকর্ষণ করার জন্য একটা লোকদেখানো ব্যাপার। এই ফোন গুলোকে ডেমো ফোন বলা হয়। আশাকরি, ডেমো শব্দটার অর্থ আপনারা বুঝতে পেরেছেন।
এখন আসা যাক ডেমো প্রার্থী প্রসঙ্গে। আপনারা জানেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ডেমো প্রার্থীর বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতীক বরাদ্দ পরবর্তী এক অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা এই প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। বলেছেন, আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করতে পারবেন। তবে সেটা হবে ডেমো প্রার্থী। সেই সাথে আরও বলেন, মনোনয়ন বঞ্চিত এমপি মন্ত্রী এবং তাদের পরিবারের কোনো সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারবেন না। আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে যারা অংশ গ্রহণ করবেন, তারা হবেন ডেমো প্রার্থী।
ডেমো প্রার্থী বিষয়টা কি, আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। তারপরও আমি বলছি। যে আসনে শুধু মাত্র একজন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন কিন্তু সেখানে বিরোধী দলগুলোর কোনো প্রার্থী নেই। সেসব আসনে যাতে বিনা ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচিত না হয়। অর্থাৎ, গত নির্বাচনে “বিনা ভোটের এমপি ” হওয়ার যে কলঙ্কের দাগ রাজনীতির ইতিহাসে লেখা হয়েছে, সেরকম কোনো পরিস্থিতি যাতে এই নির্বাচনেও হতে না পারে। সে কারণেই নিজ দল থেকে এক বা একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নিজ দলের এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কোনো অবস্থাতেই দলীয় আদর্শ এবং দলীয় প্রতীকের জন্য ক্ষতির কারণ হবেনা। শুধু মাত্র নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তারা কাজ করবে। দলীয় প্রার্থীর খরচেই ডেমো প্রার্থীদের নির্বাচনের ব্যয় বহন করা হবে এমন তথ্যও জানা গেছে। ডেমো প্রার্থীরা মূলত লোকদেখানো প্রার্থী। কোনো অবস্থাতেই বিদ্রোহী প্রার্থী নয়।
মনোনয়ন বঞ্চিত এমপি মন্ত্রী এবং তাদের পরিবারের কোনো সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারবেন না, যদি এরকম ঘটনা ঘটে তবে আজীবন দল থেকে বহিষ্কার করা হবে এমন তথ্য ও গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। শীঘ্রই আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করার কথা রয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর “ডেমো প্রার্থী ” বিষয়টাকে অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন কিছু মনোনয়ন বঞ্চিত এমপি মন্ত্রী। সেটা কেন করেছেন তা জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের নিকট থেকে নৌকা প্রতীক কেড়ে নেয়ার ফলে তারা নেত্রী এবং দলের উপর বেজায় রুষ্ট হয়েছেন। ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে ভয়াবহ পথ বেছে নিয়েছেন। ভুল তথ্য দিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্ত করেছেন। প্রচার করছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র নির্দেশে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, রীতিমতো নৌকা প্রতীক পাওয়া প্রার্থীকে হারানোর জন্য সব রকম অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ সরাসরি দলীয় মনোনয়নকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, প্রকাশ্যে নৌকা বিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন।
গাজীপুর ৩ আসনের মনোনয়ন বঞ্চিত এমপি ইকবাল হোসেন সবুজ এ ক্ষেত্রে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে আছেন। তিনি গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েও সরাসরি দলীয় মনোনয়নকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি ডেমো প্রার্থী’র সুযোগ নিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সে হিসাবে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন।
তার সাথে উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং পৌর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকেই রয়েছেন। তিনি দাবি করছেন, তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত স্বতন্ত্র প্রার্থী।
যদিও পুরো ঘটনাটি একটি কূটকৌশল ছাড়া কিছু নয়। কারণ, শেখ হাসিনা তার কাছ থেকে নৌকা কেড়ে নিয়ে তাকে নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচন করতে বলেছেন, এমন কথা কোনো যুক্তিতেই বিশ্বাস যোগ্য নয়। বিশ্বাস করার কোনো কারণও নেই। তবে সবুজ সাহেব এবং তার লোকজন এমনটাই প্রচার করছেন। এর মাধ্যমে সবুজ সাহেব যা করছেন, তাকে এক কথায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বলা হয়। তিনি দলীয় নেতা-কর্মী এবং জনগণের সাথে মিথ্যাচার করছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে প্রতারণা করছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দলীয় আদর্শ এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের মাধ্যমে জঘন্যতম অপরাধ করেছেন। আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন, এই সময়ের মধ্যে তিনি তার অবস্থান থেকে সরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে শতভাগ। অন্যথায় দলীয় সিদ্ধান্তের গ্যাঁড়াকল প্রস্তুত হচ্ছে তার জন্য। সে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আমাদের কথা হলো, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী কমিয়ে ফেলবে। মনোনয়ন বঞ্চিত এমপি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আমরা মনে করি, বিদ্রোহী প্রার্থী বিষয়ে আওয়ামী লীগের নমনীয় আচরণ করা উচিত। তাদের নির্বাচন করতে দেওয়া উচিত। নির্বাচন জমজমাট হোক, মানুষ নির্বাচন উপভোগ করুক। এদেশের মানুষ ভোট ভোট খেলা পছন্দ করে, উৎসব উৎসব আমেজে অভ্যস্ত। প্রার্থীরা নির্বাচন উপলক্ষে কিছু পয়সাপাতি খরচ করে, এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই, নির্বাচন বিষয়ে দলীয় উদারতা প্রত্যাশা করছি আমরা।
শেষ কথা , ডেমো প্রার্থী বিষয়টা জনগণ বুঝতে পারলেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সবুজ সাহেব হয়তো বুঝেননি। এতে আমরা কিছু মনে করছিনা। আমরা চাই তিনি নির্বাচনের মাঠে থাকুন শেষ পর্যন্ত। মনে প্রাণে চাই। নৌকাকে চ্যালেঞ্জ করার ফলাফল তিনি প্রাপ্য। প্রাপ্য টুকু তিনি বুঝে নিন। আমরা বিশ্বাস করি, জননেত্রী শেখ হাসিনা নৌকা প্রতীকের জন্য ক্ষতি হবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেননা। “ডেমো প্রার্থী” থিউরিও অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করি। তবে থিউরি’র সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। সেটা নিশ্চয়ই তিনি করবেন।
লেখক: আনোয়ার হোসেন
সংবাদকর্মী এবং অনলাইন এ্যাক্টিভিষ্ট।
