ঢাকাশুক্রবার , ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য
বিজ্ঞপ্তি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পহেলা বৈশাখ ফিরে আসে বারবার, আসেনা শৈশবের সেই আনন্দ-উল্লাস

আল সাদি
এপ্রিল ১৪, ২০২৪ ৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
link Copied

আমার শৈশবে বেড়ে উঠা ময়মনসিংহে। আমাদের গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে আয়োজন করা হতো নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানের। আয়োজন করা হতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও। সারাদিন মাইকে বাজতো পহেলা বৈশাখের গান – ‘বাজেরে বাজে ঢোল আর ঢাক,এলো রে পহেলা বৈশাখ। আজ কৃষ্ণচুড়ার ডালে, ঢেকেছে লালে লালে, সেই রঙ হৃদয়ে ছড়াক।’ আমরা ছোটরা পহেলা বৈশাখের দিন সাদা বৈশাখী ফতুয়া (সাবেকি ধাঁচের সাদামাটা এক পোশাক) ও মুখোশ পড়ে ঘুরতাম। স্কুলের ছেলে মেয়েরা নাচ-গান প্রতিযোগিতায় অংশ নিতো। পুরস্কার হিসেবে সেসময় দেওয়া হতো মগ-গ্লাস, মেলামাইনের থালা এসব। তবে এখন স্কুলগুলোর অনুষ্ঠানে দেওয়া হয় ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ সহ অনেক বড় বড় পুরস্কার যা সেসময় আমরা চিনতাম না।

আমাদের হরিরামপুর গ্রাম ছিলো বিদ্যুৎহীন গ্রামীন বাজারে গুটিকয়েক দোকানে ছিলো টেলিভিশন। সেগুলোও চলতো বড় বড় ব্যাটারি দিয়ে। ব্যাটারিগুলো চার্জ দিয়ে আনতে হতো শহর থেকে, যা দিয়ে চলতো সপ্তাহখানেক। পহেলা বৈশাখের দিন আমরা টেলিভিশন দেখতে চলে যেতাম বাজারে। তখন ৬০ বা ৭০ টাকা দেওয়া হতো আমাদের বৈশাখে খাওয়ার জন্য। আমি কিছুক্ষনের মাঝেই টাকাগুলো খরচ করে আবারো বাসায় আসতাম টাকা নিতে। যার জন্য কতবার যে বকা খেতে হয়েছে আম্মার কাছে তার হিসাব নেই। বৈশাখের বিকেলে আমাদের বাজারের পাশেই ফাঁকা একটা স্থানে ছোট পরিসরে মেলা বসতো। যেখানে মাটির ছোট ছোট টেপা পুতুল, হাড়ি পাতিল, মাছ, পাখি, মাটির ব্যাংক নিয়ে আসতো দূর গাঁয়ের পালেরা (মৃৎ শিল্পী)। মেলায় সারাদিন হালুয়া-রুটি, কদমা, বাতাসা, মুরলি, খাগড়াই, নিমকিসহ আরো কত কী খেয়ে সন্ধ্যায় ধানক্ষেতের আইল দিয়ে বাড়ি ফিরতাম ভয়ে ভয়ে। ভয় তখন একটাই তালগাছে থাকা ভুত। ভয়ের কারন হলো নানুর মুখে শুনেছিলাম আমার ছোট মামাকে নাকি একদিন মেলা থেকে আসার পথে ভুত পথ আটকিয়েছিলো।

সেই কথা মনে পড়ে যাওয়ায় মেলা থেকে আসার সময় পকেটে করে কিছু খাবার নিয়ে আসলাম। যেন ভুত পথ আটকালে তাদেরকে দিয়ে ছাড়া পেতে পারি। সেই দিনগুলো ভুলার মতো নয়। সেবার পহেলা বৈশাখের আগে কুড়িগ্রাম থেকে আমার ছোট ফুপু আসলেন বেড়াতে। সঙ্গে এলেন তার একমাত্র কন্যা ডাকনাম ‘ময়না’ বয়স পাঁচ কিংবা ছয়। শুনেছি সে অঞ্চলে কন্যা শিশুদের ময়না বলেই ডাকা হয়। আমার ছোটবোনের বয়সও তখন ছয়। মেলা থেকে আমি সবুজ রঙ করা একটি টিয়া পাখি ও গোলাপি রঙের একটি মাছ কিনে এনেছিলাম দুপুরে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখি তারা দু’জন মারামারি করছে এই মাটির জিনিসগুলো নিয়ে। পরে ছোট ফুপু বললেন বাজার থেকে কিছু পুতুল কিনে নিয়ে আসতে ময়নার জন্য। আমি যেতে চাইনি ভুতের ভয়ে। অন্ধকার গ্রাম, কাঁচা মাটির সড়ক কোথাও আলো নেই। শুধু দূরে আমাদের বাজারে টিপটিপ করে কিছু বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে। বৈশাখের পরেরদিন আমাদের বাড়িতে আমার দাদা (সাবেক জনপ্রতিনিধি) বাজার থেকে ভাড়া করে একটি টেলিভিশন নিয়ে আসলেন। গ্রামের সবাই মিলে সিনেমা দেখবো সেজন্য। সিনেমা দেখতে গ্রামের শতশত নারী-পুরুষ আসলেন আমাদের বাড়িতে। উঠানে বসানো হলো বড় টেবিল তার উপর ২১ ইঞ্চি বক্স টিভি (সিআরটি টিভি)। পাশেই চুলায় বসানো হলো চায়ের কেটলি সারারাত চা খাবে বড়রা। টিভি চলবে বড় বড় সেই ব্যাটারিগুলো দিয়ে। আমার তখন পুরো রাজপুত্রের মতো ভাবসাব চোখে রঙিন চশমা পড়নে জিন্সের প্যান্ট আর নতুন শার্ট। কারন গ্রামে শুধু আমাদের বাড়িতেই টেলিভিশন এসেছে। সেদিন রাতে প্রথমেই টেলিভিশনে চালানো হলো ওপাড় বাংলার প্রসেনজিৎ আর রচনা ব্যানার্জীর একাই-একশো সিনেমা। সবাই খুব মন দিয়ে দেখলো সঙ্গে আমিও আম্মার কোলে শুয়ে শুয়ে সিনেমা দেখলাম। সিনেমা দেখার একপর্যায়ে চায়ের ওখানে গিয়ে চা নিলাম আমিও এক কাপ চায়ে আধাকাপের মতো শুধু চিনি দিয়ে। তারপর চললো শাকিব খান আর অপু বিশ্বাসের একটা ছবি আর শেষ রাতে চললো মিথুন চক্রবর্তীর এমএলএ ফাটাকেষ্ট। সিনেমা দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সে খেয়াল নেই। ঘুম থেকে উঠে দেখি সকাল হয়ে গেছে।

এরপর সময়গুলো বদল হতে থাকলো গ্রামের মাঠগুলোও ধীরে ধীরে ভরাট হতে থাকলো। গ্রামে আসলো সৌর বিদ্যুৎ। প্রায় সবার বাড়িতেই তখন বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে। তবে এলাকার কিছু বিত্তশালীদের বাড়িতে তখন শুধু আলোই নয় সাদাকালো টিভি থেকে শুরু করে ফ্যান সবই চলতে লাগলো সৌর বিদ্যুৎ এর মাধ্যমে। এরপর একটা সময় গ্রামে এলো পল্লী বিদ্যুৎ। সড়কগুলো হলো মাটির কাঁচা রাস্তা থেকে পিচ ঢালাইয়ে উন্নিত হলো। এখন দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টার বাড়ির পাশ দিয়ে বড় বড় বাহন চলাচল করে। সবকিছুর মাঝেও হারিয়ে গেছে পহেলা বৈশাখ কিংবা বাংলা নববর্ষ বরণের সেই উৎসাহ আমেজ। এখন আর গ্রামে সেই আবেশটা নেই যা আগে ছিলো। গ্রামের শিশু কিশোররাও আগের মতো পহেলা বৈশাখ কিংবা গ্রাম্য মেলা নিয়ে ভ্রুক্ষেপ করেনা। কিছুদিন আগে গ্রামে গিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম শুধু শহরের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরাই শুধু ফোন চালায়। তবে আমার ধারনা ভুল প্রমাণিত হয় যখন গ্রামে গিয়ে দেখলাম ১৩-১৪ বছর বয়সী ছেলেদের হাতেও এখন স্মার্টফোন। তাদের বেশিরভাগই ফেসবুকিং, গেমস লুকিয়ে ধূমপান করা এসব নিয়েই এখন ব্যস্ত থাকে। তাদের সাথে কথা বলে বুঝলাম যে স্কুলেও এখন আর আগের মতো ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালন হয়না। তারা জানেও না কখন বাংলা কোন মাস। নতুন প্রজন্ম এখন ইংরেজি খ্রিস্টাব্দে অভ্যস্ত। ইংরেজি নতুন বছরে তারা আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে। আতশবাজি থেকে শুরু করে ফানুস উৎসব সবই থাকে সেসময়।

দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশেষ করে গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে যেন শিক্ষকেরা নিজ উদ্যেগে বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানায়। শিশুদেরকে গুরুত্বের সাথে বাংলা মাসগুলো যেন শেখানো হয়। কখন কোন ঋতু, কখন গ্রীষ্মকাল, কখন বর্ষাকাল এগুলোও যেন যত্নের সঙ্গে বুঝানো হয়। মনে রাখতে হবে আজকের শিশুরাই আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যত। তাদেরকে একটি সুন্দর শৈশব ও কৈশর উপহার দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব হওয়া উচিত।

বর্তমানে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশের ধারাকে সচল ও সর্বব্যাপী করা যেমন জরুরি। পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও মাতৃভাষানির্ভর বিজ্ঞানভিত্তিক একমুখী হওয়া আবশ্যিক। একদিনের উৎসব-পার্বণ পালনের চেয়ে জরুরি মনে-প্রাণে বাঙালি হওয়া। তাতেই নিজেদের দৈন্য-হীন মানসিক বৈকল্য বদলানো সম্ভব হবে। সেটা সম্ভব না হলে বাংলাদেশ থাকবে কিন্তু বাংলাভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য যেভাবে থাকা উচিত সেরূপ নিশ্চয় থাকবে না। আমরা আমাদের জাতিসত্তা হারিয়ে সংকর জাতিতে পরিণত হব। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলা হয়েছে। তবে সেটা কাগজে-কলমে। বাস্তবে সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষার প্রচলন হয়নি। বাংলাভাষা-বাংলা সন-তারিখের ব্যবহারে রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা নেই। এসব বিষয়েও যেন সংশ্লিষ্টরা কর্ণপাত করেন।


লেখক: আল সাদি

বাংলাদেশ প্রতিনিধি,ওঙ্কার অনলি ট্রুথ, ভারত।

ই-মেইল : mssadi9655@gmail.com