ঢাকাশনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • অন্যান্য
বিজ্ঞপ্তি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সংসদীয় আসন গাজীপুর-৩ নিয়ে নাগরিক ভাবনা কামরুজ্জামান

link Copied

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই গাজীপুর বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় এ জেলার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। গাজীপুরকে এখন শিল্প নগরীও বলা হয়। গাজীপুরে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা অংশ হচ্ছে সংসদীয় আসন গাজীপুর-৩ এ অবস্থিত। সংসদীয় আসন-৩ মূলত শ্রীপুর উপজেলা , গাজীপুর সদরের ভাওয়ালগড়, পিরুজালী, মির্জাপুর এবং বাড়িয়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই সংসদীয় আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ।

এখন কথা হলো- আমরা কেমন গাজীপুর-৩ চাই।
প্রথমেই যে বিষয়টি চলে আসে তা হলো – আমরা পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও উন্নত গাজীপুর চাই। পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও উন্নত গাজীপুর-৩ গড়ে তুলতে হলে যা প্রয়োজন তা হলো-

১. নিরাপদ ও মানবিক উপশহর হিসেবে গাজীপুর- ৩ কে গড়ে তুলতে হবে । এর জন্য যা করতে হবে তা হলো- সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ মুক্ত গাজীপুর -৩ গড়ে তুলতে হবে। ভূমিদস্যু মুক্ত গাজীপুর -৩ হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্বশীল হতে হবে। নাগরিক সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল বাড়াতে হবে।

২. শ্রীপুর পৌরসভা এবং গাজীপুর সদর উপজেলাকে পরিকল্পিত শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে । আর এর জন্য যা করা প্রয়োজন তা হলো – ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে পূর্ব পশ্চিমে ভিতরে দিকের লিংক রোডগুলো স্থায়ী রড সিমেন্টের ঢালাই করতে হবে। নতুন শিল্প কারখানার ক্ষেত্রে অবশ্যই গ্রিণ শিল্পের ওপর জোর দিতে হবে। সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিবেচনায় অধিকতর যাচাই বাছাই করে বাস্তবায়ন করতে হবে। রাস্তা ঘাট প্রসস্থ ও পাকা করতে হবে। বাড়িঘর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নের দিকে নজর দিতে হবে।

৩. সংসদীয় আসন গাজীপুর- ৩ এর শিল্প প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। এর জন্য – নতুন শিল্প কারখানাগুলো হতে হবে গ্রিণ শিল্প, এবং পরিবেশ ও কৃষি জমির ক্ষতি হয় এমন জায়গা হতে দূরে গড়ে তুলতে হবে । এলোমেলো ও বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠা শিল্প কারখানা বন্ধ করতে হবে। গাজীপুর যেহেতু শিল্প নগরী সেক্ষেত্রে গাজীপুরে একটি ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে এলোমেলোভাবে গড়ে উঠা শিল্প কারখানায় শৃঙ্খলা আনয়ন করা সম্ভব হবে।

৪. দূষণমুক্ত গাজীপুর -৩ হতে হবে। দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন পরিবেশ সুরক্ষার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ। এর জন্য – পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রশাসন এবং সুশীল সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এ লক্ষে সরকারি উদ্যোগে ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সমন্বয়ে পরিবেশ সুরক্ষা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। নদী খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো দূষণমুক্ত রাখতে হবে। যেগুলো দূষণ হয়ে গেছে সেগুলো দূষণমুক্ত করতে হবে। আবাসন ও পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। শিল্প বর্জ্য বিশেষ করে তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি বাধ্যতামূলক চালু রাখতে হবে এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

৫. বন ও বনভূমি রক্ষায় বিশেষ মনিটরিং থাকতে হবে। গাজীপুর-৩ এর বন ও বনভূমি রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা খুবই প্রয়োজন। আর এ লক্ষে – ভাওয়ালগড়ের বনভূমি, অন্যান্য বন ও বনভূমির জায়গা রক্ষা করতে হবে। ভাওয়ালগড়সহ অন্যান্য বনভূমির ভিতরে যে সকল শিল্প কারখানা, আবাসিক ভবন, হোটেল, রিসোর্স ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে এবং বনের ভিতরে যে সকল করাতকল বা স মিল গড়ে উঠেছে সে গুলো বন্ধ করতে হবে। স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন করে বনায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

৬. নদী, খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় দখলমুক্ত হতে হবে। সংসদীয় আসন গাজীপুর-৩ এর নদী, খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় যে গুলো দখল হয়েছে সেগুলো দখল মুক্ত করতে হবে। আর এ লক্ষ্যে – নদী খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে, এবং দখলকারীদের হাত থেকে দখলমুক্ত করতে হবে। নদী ও খাল দখলকারী ভূমিদস্যুদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। নদীর তীরে বা নদীর পাড়ে গড়ে উঠা শিল্প কারখানা বন্ধ করতে হবে।

৭. যানজটমুক্ত গাজীপুর- ৩ হতে হবে । আর এর জন্য প্রয়োজন -ট্রাফিক ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন। ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে প্রতিটি লিংক রোডের মুখে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করতে হবে। ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে অবৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ পরিবহন তুলে দিতে হবে। মহাসড়ক হতে হবে অবৈধ দখলমুক্ত। মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং ও দোকানপাট বন্ধ করতে হবে।

৮. গাজীপুর- ৩ এ অটোরিকশার শৃঙ্খলা আনয়ন করতে হবে। আর এর জন্য দরকার – অটোরিকশার উৎপাদন বন্ধ ও চলমান অটোরিকশার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রনয়ণ করা। অটোরিকশা ও অটোরিকশার ড্রাইভারদের লাইসেন্স ও পরিচয় পত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের জন্য পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে আলাদা মনিটরিং সেল থাকতে হবে। যেখানে প্রত্যেকটি অটোরিকশার নির্দিষ্ট রেজিষ্ট্রেশন নম্বর থাকবে, থাকবে ড্রাইভারদের পরিচয়। একটা স্ট্যান্ডে কতটা অটোরিকশা থাকবে তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। প্রয়োজনের বেশি অটোরিকশা কোনোভাবেই অনুমোদন দেয়া যাবে না। শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় ভাগ করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে একজন অটোরিকশাওয়ালা ৮, ১০ ঘন্টার বেশি অটোরিকশা চালাতে পারবে না।

৯. ভারি যানবাহন চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সময় করে দিতে হবে। এর জন্য যা করতে হবে -প্রথমেই ভারি যানবাহনগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। ভারি যানবাহন গুলোর মধ্যে লড়ি, বড় পিক-আপ ভ্যান, ড্রাম ট্রাক ইত্যাদি লিংক রোড গুলোতে চলাচলের জন্য নীতিমালা প্রনয়ণ করতে হবে। রাত ৮ টার পর মালামাল পরিবহনের জন্য ভারি যানবাহগুলো চলাচল করবে। দিনের বেলায় চলাচল করলে গতিসীমা ৩০ কিলোমিটার এর অধিক হবে না। হাইড্রলিক হর্ণ বাজানো বন্ধ করতে হবে।

১০. ফুটপাত দখলমুক্ত হতে হবে। এর জন্য -ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থিত সকল বাজার ও বাসস্ট্যান্ড হকার ও ভাসমান দোকানমুক্ত হতে হবে।
মহাসড়কে কোনো ধরনের দোকান বসতে দেয়া যাবে না। যে সব ভাসমান দোকানপাট বসে সেগুলো উচ্ছেদ করতে হবে। বিশেষ করে ভবানীপুর বাজার, বাঘের বাজার, সি এন্ড বি বাজার, মাওনা চৌরাস্তা, জয়নাবাজার ও শ্রীপুর বাজারে প্রতিদিন রাস্তা দখল করে যে সকল ভাসমান দোকান বসে সেগুলো অবশ্যই উচ্ছেদ করতে হবে।

১১. গাজীপুর- ৩ এ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য – প্রত্যেক ইউনিয়নে, পৌরসভায় একটি করে খেলার মাঠ বরাদ্দ দিতে হবে। খেলার মাঠ পরিচালনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌর কর্তৃপক্ষের তত্বাবধানে সুশীল সমাজের নাগরিকদের নিয়ে কমিটি গঠন করে দিতে হবে। এই কমিটি বছর ব্যাপী খেলাধুলা পরিচালনা করবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে। লেখক, সাংবাদিক ও শিল্পী সাহিত্যকের সমন্বয়ে এটি হতে পারে।

১২. শিশুদের জন্য বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। এই জন্য – প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় সরকারি উদ্যোগে শিশুপার্ক গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের বিনোদনের জন্য থাকবে বিভিন্ন ধরনের রাইটস ও চিত্তাকর্ষক খেলাধুলার ইভেন্ট।

১৩. সংসদীয় আসন গাজীপুর-৩ এ প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় সরকারি উদ্যোগে একটি করে লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে।

সংসদীয় আসন গাজীপুর-৩ হতে পারে সারা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও পরিচ্ছন্ন সংসদীয় আসনের রোল মডেল। এমনটাই প্রত্যাশা করে এখানকার মানুষ। আশা করি যিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন তিনি সত্যিকার অর্থেই গাজীপুর-৩ কে পরিচ্ছন্ন ও উন্নয়নের রোল মডেল অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলবেন।



কামরুজ্জামান: কলাম লেখক ও গবেষক
সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ
মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর সদর, গাজীপুর।