নিত্যবেলা প্রতিবেদক:
গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় ওষুধ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামকে ধরে নিয়ে অস্ত্র ও হত্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে ওসি নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অথচ ওই ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে সরাসরি ঘুষের দুই লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ উঠলেও শাস্তি পেয়েছেন থানার তিন উপপরিদর্শক (এসআই)। এদিকে পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ এই প্রতিবেদককে দিলেন ভিন্ন তথ্য।
জানা যায়,ওষুধ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম কোনাবাড়ী হাউজিং এলাকার হোসেন আলী মুন্সীর ছেলে। কোনাবাড়ী বাজার এলাকায় তার ওষুধের দোকান রয়েছে। নুরুল ইসলামকে ধরে নিয়ে টাকা নেয়ার খবর একাধিক জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হলে ঘটনার তদন্তে পুলিশের এডিসি (উত্তর) রবিউল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ। পরে ১২ জানুয়ারি,২৫ রাতে কোনাবাড়ী থানার তিন এসআইকে প্রত্যাহার করে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। প্রত্যাহার করা পুলিশ সদস্যরা হলেন- কোনাবাড়ী থানার সেকেন্ড অফিসার উপ-পরিদর্শক (এসআই) উৎপল সাহা, উপ-পরিদর্শক (এসআই) হানিফ মাহমুদ ও উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল কাশেম।
তবে এ ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরও রহস্যজনকভাবে তিন এসআইকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যাহারকৃত পুলিশ সদস্যরা। অর্থ লেনদেনে কোনো সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই প্রত্যাহার করায় বিব্রত তারা। ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও তাকে বাদ দিয়ে তিন এসআইকে প্রত্যাহার কেন করা হয়েছে তার উত্তর তারা কেউই জানেন না! এই বক্তব্যের পাশাপাশি এসআই আবুল কাশেম এও বলেন, ওসি নজরুল ইসলাম স্যার ঘুষ গ্রহণ করেছেন কিনা জানা নেই। আমার বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোন অভিযোগ নেই। তবে এডিসি স্যার চাইলে আমাকে প্রত্যাহার করতে পারেন। তা বিধিতে বলা আছে।
কোনাবাড়ি থানা থেকে প্রত্যাহারকৃত সেকেন্ড অফিসার উপ-পরিদর্শক উৎপল সাহা জানান, আমাকে কেন প্রত্যাহার করা হলো এখনো আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। আমাকে দুদিন সময় দিন। উদ্ধর্তন স্যারদের থেকে সবিস্তারে জেনে বিস্তারিত জানাতে পারবো। উৎপল সাহা সঙ্গে যোগ করেন, ওষুধ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামকে যে সন্ধ্যায় ধরে নিয়ে আসা হলো তখন তিনি থানাতেই ছিলেন। ওসির কক্ষে নুরুল ইসলামকে দেখেছেনও। তবে অনৈতিক অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
এ ব্যাপারে প্রত্যাহারকৃত তিন এসআই জানান, বিভিন্ন পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ হয় ওসির বিরুদ্ধে, কিন্তু রহস্যজনকভাবে ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদেরকে প্রত্যাহার করায় তারা বিস্মিত। এ ঘটনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান প্রত্যাহার হওয়া ওই তিন এসআই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থানার এক পুলিশ সদস্য বলেন, ওষুধ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামকে আটক করে থানায় নিয়ে আসার পর সেদিন রাত আনুমানিক একটা থেকে দুইটার মধ্যে হাজতখানা থেকে নুরুল ইসলামকে বের করে ওসির শোয়ার কক্ষে (বেডরুমে) নেয়া হয়। সেখানে স্থানীয় বিএনপি কর্মী আজিজ এবং শামীমের মধ্যস্থতায় ২ লাখ টাকার বিনিময়ে আপোষ হওয়ার পর নুরুল ইসলামকে প্রসিকিউশন মামলা দেয়া হয়।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ওষুধ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তার ভাষ্যমতে, যেই তিন এসআইকে প্রত্যাহার করা হয়েছে তারা তাকে বা তার পরিবারকে অস্ত্র ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে কোনো হুমকি-ধামকি দেননি। তাদের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের বিষয়েও কোনো কথা হয়নি। তবে কয়েকটি পত্রিকায় নিরপরাধ হওয়া সত্ত্বেও ওই তিন এসআইয়ের নাম যোগ করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রত্যাহারকৃত তিন এসআইকে জড়িয়ে তিনি কোনো সংবাদ মাধ্যমে বক্তব্যও দেননি।
বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ নিত্যবেলাকে বলেন, কোনাবাড়ি থানার ওই তিন এসাইকে ঘুষ কাণ্ডের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়নি। ঘুষকান্ডের তদন্তের সঙ্গে তিনজনের প্রত্যাহারের সময়টি মিলে যাওয়া স্রেফ মিরাকল। তিন এসআই-এর মধ্যে হানিফ মাহমুদকে ঘুষকান্ডের অভিযোগ উঠার আগেই প্রত্যাহার করা হয় গত ২১ নভেম্বর, ২০২৪, বাকি দুজন আবুল কাশেম ও উৎপল সাহাকে প্রত্যাহার করা হয় গত ১১ডিসেম্বর,২০২৪ এ। আমার কাছে আদেশ কপি আছে। আপনি চাইলে কোনাবাড়ি থানা থেকেও তা সংগ্রহ করতে পারেন বা আমি আপনাকে দিতে পারি। তাহলে এই ঘটনায় কিভাবে তাদেরকে প্রত্যাহার করা হলো? তিনি আরও বলেন, হানিফ মাহমুদ দীর্ঘদিন কোনাবাড়ি থানায় আছেন। থানা পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় লোকজন তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ জানান। এমনকি একটি ছিনতাই মামলার আসামীকে ছেড়ে দেওয়ারও অভিযোগ আছে হানিফের বিরুদ্ধে। যদিও মামলাটির চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।
সেকেন্ড অফিসার উপ-পরিদর্শক উৎপল সাহার বিরুদ্ধেও তিনি একাধিক অপরাধে যুক্ত থাকার কথা জানান। তিনি বলেন, উৎপল সাহা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অনৈতিক কাজের সহযোগী শক্তি ছিল। গত ৫ আগস্ট প্রকাশ্য দিবালোকে হৃদয় নামে একজন লোককে হত্যা করা হয়। তার ভিডিও ফুটেজও আছে। উৎপলকে নির্দেশ দেয়া হলো হত্যা রহস্য তদন্ত করে উদঘাটন করার জন্য। লাশটি খুঁজে বের করার জন্য। তখন উৎপল কোনাবাড়ি থানার সেকেন্ড অফিসার। দীর্ঘদিন আছে। সে চাইলেই এটার বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত করতে পারতো। তা না করে সে কালক্ষেপণ করতে থাকে। মামলার অগ্রগতি দূরে থাক্ সে দিনের পর দিন অসহযোগিতা করে গেছে। লাশটিও খুঁজে বের করতে পারেনি। এটি ছাড়াও বিস্তর অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। সঙ্গত কারণে তাকে শোকজ করা হয়। সন্তুষজনক জবাব না পাওয়ায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আমরা জনসাধারণের সেবক। সেবা দিতে এ পেশায় এসেছি। অনিয়ম করার সুযোগ এখানে নেই।
আবুল কাশেমকেও একাধিক অভিযোগ ও অপকর্মে জড়িত থাকার কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ওসি নজরুল ইসলামের ঘুষ গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই প্রতিবেদন হাতে পাবো। সত্যতার প্রমাণ মিললে বিধি মোতাবেক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনাবাড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নজরুল ইসলাম নিত্যবেলাকে বলেন, আমি ঘুষ গ্রহণ করিনি। আমার বিরুদ্ধে এটা সুস্পষ্ট ষড়যন্ত্র। এ অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
উল্লেখ্য, ওষুধ ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামকে গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কোনাবাড়ীর ওষুধের দোকান থেকে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। পরে ৫ লাখ টাকা থেকে দেন-দরবারর করে ২ লাখ টাকায় বিষয়টি সুরাহা হয়। আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা ধার-দেনা করে টাকা দেওয়ার পরও তাকে ছেড়ে না দিয়ে মেট্রোপলিটন অধ্যাদেশ আইনে পরদিন ৪ জানুয়ারি সকালে আদালতে পাঠানো হয়। ওই দিনই আদালত তাকে জামিন দেয়।
২২.০১.২৫
