কতিপয় ব্যক্তি আছেন, যারা নিজেদের লোকগবেষক দাবি করেন, ফোকলোরিস্ট দাবি করেন। বাউল, সুফি, বৈষ্ণব তথা বাংলার মরমিয়া আন্দোলনের ওপর মারিং-কাটিং করে বড় বড় বই রচনা করেন। অথচ তাদের কাছে লালন সাঁইর মানবতাবাদের গুরুত্ব নেই, লালনকে তারা মুসলমান প্রমাণ করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালান, লালনের ভাবসাধনাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন, বাউল এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতবাদের রিচ্যুয়ালসমূহকে তারা ‘ব্যাভিচার’ হিসেবে সাব্যস্ত করেন, বাউলসাধনার নানা বিষয়সমূহকে তারা ঘৃণার চোখে দেখেন, বাংলার সহজিয়া মাজার-সংস্কৃতি তাদের কাছে অপসংস্কৃতি। বহুত্ববাদ বা বহুত্ববাদী সংস্কৃতি কী, তার কিছুই তারা বোঝেন না।
এরা আসলে ধান্দাবাজ, ফোকলোর-ব্যবসায়ী। বাংলার লোকদর্শন বিষয়ে, বাউল-সুফি-বৈষ্ণব মতবাদ বিষয়ে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক পণ্ডিতজনের আগ্রহ আছে। এই ধান্দাবাজ ফোকলোর-ব্যবসায়ীরা ফোকলোর গবেষণার নামে নানা মনগড়া কথাবার্তায় ঠেঁসে ঢাউস ঢাউস বই-পুস্তক লিখে নানাভাবে সেসব পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন, নানা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন, ফোকলোরিস্ট হিসেবে পরিচিতি লাভের চেষ্টা করেন, বাউল-বৈষ্ণব-সুফি ভাবধারাকে বিদেশে ভুলভাবে উপস্থাপন করেন, এমনকি ফোকলোরিস্ট হিসেবে দেশের নানা পুরস্কার-সম্মাননা বাগিয়ে নেন।
এরা নিজেদের মতাদর্শ লালনের ওপর চাপিয়ে দেন। এরা নিজেদের মতাদর্শ দিয়ে বাংলার ভাবসম্পদকে বিচার করেন। এদের কাছে থেকে সাবধান থাকা জরুরি। এদের কাছে লালন নিরাপদ নন, বাংলার ভাবসম্পদও নিরাপদ নয়।
লেখক: স্বকৃত নোমান, কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক।
