১৪ ই ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এই ভালোবাসা দিবস আমাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আনন্দের সাথে কাটুক। পৃথিবীর সবচে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর মধ্যে একটিকে বলা হয় ‘লাভ’ বা ভালোবাসা। পৃথিবীর প্রত্যেকটি প্রাণীর মধ্যে ভালোবাসা বিদ্যমান।
জীব-জগতের মধ্যে আন্ত সম্পর্ক হল ভালোবাসা।ভালোবাসা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, যা শুধুমাত্র অনুভূতি দিয়ে প্রকাশ করতে হয়। ভালোবাসার রং রূপ গন্ধ কিছুই নেই আছে শুধু অনুভূতি। যার শক্তিতে পৃথিবীর এক প্রাপ্ত থেকে অন্য প্রাপ্ত জয় করা হয়। যান্ত্রিক মানুষ পর্বতসম ব্যস্ততা উপেক্ষা করে আজ প্রিয়জনকে বলবে, ‘শুধু তোমাকেই ভালোবাসি’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়তো ঠিক এমনই মুহূর্তকে স্মরণ করে লিখেছেন, ‘দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর, ভালোবাসিবারে দে আমায় অবসর!’ আজ সেই ভালোবাসার দিন। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। অন্যদিকে আজকের এ ভালোবাসা শুধুই প্রেমিক আর প্রেমিকার জন্য নয়। মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, ভাইবোন, প্রিয় সন্তান এমনকি বন্ধুর জন্যও ভালোবাসার জয়গানে আপ্লুত হতে পারে সবাই। হতে পারে পরিবার, সমাজ এমনকি দেশের জন্য ভালোবাসা। দুটি প্রাচীণ রোমান প্রথা থেকে জানা যায় এই ভ্যালেন্টাইন’স ডে অর্থাৎ ভালোবাসা উৎসবের সূত্রপাত হয়েছে একজন বিখ্যাত সেইন্ট বা ধর্ম যাজকের নাম থেকে। প্রথম ভ্যালেন্টাইন’স ডে ছিল ৪৯৬ সালে। প্রাচীণ রোমের ইতিহাস মতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কারারুদ্ধ হওয়ার পর প্রেমাসক্ত যুবক-যুবতীদের অনেকেই প্রতিদিন তাকে কারাগারে দেখতে আসত এবং ফুল উপহার দিত। তারা বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক কথা বলে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে উদ্দীপ্ত রাখত। এক কারারক্ষীর এক অন্ধ মেয়েও ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে যেত। অনেকক্ষণ ধরে তারা দু’জন প্রাণ খুলে কথা বলত। এক সময় ভ্যালেন্টাইন তার প্রেমে পড়ে যায়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় অন্ধ মেয়েটি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। ভ্যালেন্টাইনের ভালবাসা ও তার প্রতি দেশের যুবক-যুবতীদের ভালবাসার কথা সম্রাটের কানে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ২৬৯ খৃষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে মৃত্যুদন্ড দেন। সেদিনের পর থেকে প্রতিবছরই পালন করা হয় ভ্যালেন্টাইনস ডে।
ভালোবাসা আল্লাহ প্রদত্ত এক উপহার। প্রত্যেক ধর্মে ভালোবাসাকে পবিত্র বলে গণ্য করা হয়। ভালোবাসা নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক কল্পকাহিনী, রচিত হয়েছে ইতিহাস। আমরা যেমন জানি সম্রাট শাহজাহান এর ভালোবাসার অমর কাহিনী তেমনি জানি আদম-হাওয়া, ইউসুফ-জুলেখা, রাধা-কৃষ্ণ, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েট এর কাহিনী। এঁরা অমর হয়ে আছে। আমরা যেমন ভালোবাসি আমাদের বাবা-মা, ভাই-বোন, আর ভালোবাসি আমাদের প্রিয় মানুষটিকে। এই প্রিয় মানুষটি হতে পারে আমাদের জীবনসঙ্গী, হতে পারে ভালো কোন ফ্রেন্ড। তবে এই ইন্টারনেটের যুগে ভালোবাসা দিবস বলতে যা আমরা বুঝি, তা হলো উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীর প্রেম-ভালোবাসাকে। কালের বিবর্তনে আজ ভালোবাসা দিবস আমাদের দেশে একটি মূল্যবান দিন সময় ও আধুনিক ফেস্টিভ্যাল ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে, যা রবিঠাকুরের ভাষায়- সখি ভালোবাসা কারে কয়, সেকি শুধুই যাতনাময়।’
এই ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের মাঝে যে প্রভাব পড়েছে তা হলো নিজের সব কিছুকে সমর্পণ করা। আর এই সমর্পণ করা আমাদের সমাজের কাছে একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের ইয়ং জেনারেশনকে দিন দিন ধাবিত করছে পশ্চিমা বিশ্বের নগ্নতার দিকে। বর্তমানে প্রেম ভালোবাসা শরীর নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন পার্কে বা উদ্যনে গেলে যা সহজেই চোখে পড়ে। এরই ফলে আমদের পরিবার, সমাজ ও দেশকে মাঝে মাঝে কলঙ্কিত হতে হচ্ছে এবং বিব্রত হতে হচ্ছে সুধী ও মা জাতিকে।
আসলে ভালোবাসার কোন নির্দিষ্ট দিন নেই। প্রত্যেক দিন, প্রত্যেক মুহুর্তে প্রিয়জনকে ভালোবাসা যায়। প্রিয় অনভূতি, স্মৃতি, আবেগ দিয়ে সমাজ টিকে আছে। ভালোবাসার আবদ্ধে মানুষ অমর হয়ে থাকে। আজকের এই দিনে সকলের উচিৎ প্রিয়জনের সাথে সমাজ দেশটাকে ভালোবাসা। শুধু কি আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস? না! আজ সুন্দরবন দিবসও। প্রতিনিয়ত বনখেকোদের আগ্রাসনের ফলে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আজ হুমকির মুখে। সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ গোটা দেশের পরিবেশ। ভালবাসা দিবসে ভালবাসুন সুন্দরবনকে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবস পালিত হয়ে আসছে। পাশাপাশি ভাষা দিবসের এই মাসে আমাদের পূর্ব পুরুষরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মায়ের মুখের ভাষা প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাদের রক্তে পিচঢালা রাজপথ লাল হয়েছিল। আজ তাদের ভালোবাসার দিন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের চলাফেরার স্বাধীনতা দিয়েছে, দিয়েছে নতুন মানচিত্র। সেই সব বীর শহীদ ও গাজীদের ভালোবাসার দিন। সর্বপোরি দেশকে ভালোবাসতে হবে। দেশের প্রতিটা নাগরিককে ভালোবাসতে হবে। ভালোবাসা দিবসে ভালো থাকুক সকলেই। সবাইকে ভালোবাসা দিবসে প্রীতি ও শুভেচ্ছা। পরিশেষে ভালো থাকুক আমরা প্রিয় মানুষগুলো।
লেখক: আল সাদি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
