গাজীপুর প্রতিনিধি:
গাজীপুরের শ্রীপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) যাঁদের পরিচিতি এক সময় ছিল ‘প্রশাসনের নির্ভরযোগ্য মুখ’, তাঁদেরই একটি অংশ আজ নামজারি বাণিজ্যের মহাব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন। দখল না থাকা, মামলা চলমান থাকা, সীমানা নির্ধারণ অসম্পূর্ণ থাকা কিংবা রাস্তা ও সরকারি সম্পত্তির ওপর ঘষামাজা করে শ্রেণি পরিবর্তন করে নামজারি, এসব যেন এখন নিয়মিত ঘটনা। এমনকি এক জায়গার জমি নিয়ে উভয়পক্ষকে একাধিকবার নামজারি দেওয়ার নজিরও রয়েছে। এই সব অনিয়মের পেছনে রয়েছেন শ্রীপুরের সাবেক ও বর্তমান একাধিক এসিল্যান্ড এবং তাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
দলিল নেই, দখল নেই, কিন্তু টাকা দিলেই নামজারি:
২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর, শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ি গ্রামের মৃত ডা. আফছার উদ্দিনের কন্যা শামসুন্নাহার জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন (স্মারক নং: ১৭৫০২)। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, তার সহোদর ভাই প্রকৃত মালিকানা দাবিদার নন এবং নামজারির জন্য কোনো বৈধ কাগজও নেই। তিনি শুনানি চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু শুনানি ছাড়াই এসিল্যান্ড আতাহার শাকিলের নেতৃত্বে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে নামজারি সম্পন্ন হয়ে যায়।
চলমান মামলা থাকলেও দেদারছে নামজারি:
শুধু এটুকুতেই থেমে নেই শ্রীপুর ভূমি অফিসের দুর্নীতি। রাজাবাড়ি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু হানিফ আজাদের ছেলে মো. সেলিম গং গাজীপুর দেওয়ানি আদালতে মামলা করেন (নং: ২৫২/১৬)। মামলা চলমান থাকলেও এসিল্যান্ড আব্দুল্লাহ আল মামুন মোটা অংকের বিনিময়ে অপরপক্ষের নামে নামজারি করে দেন। একই ধরনের আরেক ঘটনা ঘটে সূর্যনারায়ণপুর গ্রামের জহিরুল হোসেনের ক্ষেত্রেও। ২০১৩ সালের মামলা (নং: ৪৯২/১৩) চলমান থাকা অবস্থায় এসিল্যান্ড আব্দুল্লাহ আল মামুন নামজারি সম্পন্ন করেন নালিয়াটেকি মৌজার আরএস দাগ নং: ৩৮-এর ১৮ শতাংশ জমির ওপর। অথচ ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল করা সীমানা নির্ধারণ আবেদন (স্মারক: ৬৬১) তখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
‘ক’ গেজেটভুক্ত জমিও ছাড় পায়নি, শ্রেণি বদলে ‘চালা’ বানিয়ে নামজারি:
২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজাবাড়ি গ্রামের ৭ শতাংশ ‘অর্পিত ক গেজেটভুক্ত’ জমির নামজারির বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দা বিমল চন্দ্র দাস লিখিত অভিযোগ করেন। এর পরপরই ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আরও তিনটি পৃথক অভিযোগ দায়ের হয় (স্মারক: ৩৯৭২, ৩৯৭৩, ১১৯৮১)। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে ডিসি অফিসের এসএ শাখা থেকে স্মারক ১৯৩৮-এর মাধ্যমে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। ধলাদিয়া গ্রামের মৃত শামসুদ্দিনের ছেলে জহিরুল ইসলামের জমির শ্রেণি ছিল রাস্তা। কিন্তু রেকর্ড ঘষামাজা করে ‘চালা’ শ্রেণি দেখিয়ে নামজারি করা হয়। এ বিষয়ে ৩ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ জমা দেন তিনি (স্মারক: ৩৯৭৩)। এই জালিয়াতিতে সরাসরি জড়িত ছিলেন তৎকালীন এসিল্যান্ড রেহেনা আক্তার ও রাজাবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা মো. নূর এ আলম। ২০২১ সালে ধলাদিয়া গ্রামের রাজা মিয়া (৩৫) নামজারি খারিজ বাতিলের জন্য আবেদন করেন (মিসকেস নং: ২৬২/২১)। কিন্তু শুনানি ছাড়াই অপরপক্ষের নামজারি অনুমোদন করেন এসিল্যান্ড। একই জমিতে একাধিক পক্ষকে আলাদাভাবে নামজারি দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসন জানে না কেন, নেই প্রতিবেদন: এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের এসএ শাখার কর্মকর্তা মো. খলিউর রহমান বলেন, “আমরা ইউএনও অফিসে স্মারক ১৯৩৮-এর মাধ্যমে প্রতিবেদন চেয়ে পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো জবাব পাইনি। কেন পাইনি, তাও আমাদের জানানো হয়নি।” নামজারি যেভাবে কারবার: রাজাবাড়ি ইউনিয়নের সাবেক ভূমি সহকারী কর্মকর্তা এম এ মান্নান ও অফিস সহায়ক মনিরুজ্জামান মনির নিয়মিত ঘুষ লেনদেনের মধ্য দিয়ে নামজারির ব্যবস্থা করতেন বলে একাধিক অভিযোগে উঠে এসেছে। এক জায়গায় দখল না থাকলেও কাগজপত্র ঘষামাজা করে ভিন্ন শ্রেণিতে নামজারি দিয়ে দিতেন তারা। অভিযোগ উঠেছে, ভূমি অফিসের ভলিউম বই পর্যন্ত কাঁচি ও প্রিন্ট আউটের কৌশলে বদলে ফেলা হয়।
স্থানীয়রা জানান, প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হাত ধরে যদি হয় ভূমি দুর্নীতির বিস্তার, তাহলে কোথায় যাবে সাধারণ মানুষ? আদালতে মামলা চলমান, সরকারি সম্পত্তি চুরি, শ্রেণি ঘষামাজা, জাল নামজারি, এসব যেন এখন শ্রীপুর ভূমি অফিসে নিয়মিত চিত্র। বদলি হলে তদন্ত বন্ধ হয়, তদন্ত শুরু হলে রিপোর্ট আটকে যায়, আর অভিযোগ উঠলে গা বাঁচানো বিবৃতি মেলে।
শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) (বর্তমান) আতাহার শাকিল ছুটিতে দেশের বাইরে রয়েছেন। এ বিষয়ে সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে তার বক্তব্য চাওয়া হয়। সাড়া না পেয়ে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সজিব আহমেদ বলেন, “প্রতিবেদন এসিল্যান্ড অফিসে চাওয়া হয়েছিল, ইউএনও অফিসে না। আমি গত সপ্তাহে জানতে পারি। জানার পর আমি অভিযোগকারীসহ নোটিশ দিয়েছি। এখন বক্তব্যসহ নথি যাচাই করে প্রতিবেদন দেব। আর আপনি যে সকল ক্ষেত্রে অভিযোগ দাখিল করা সত্ত্বেও শুনানি ছাড়া নামজারির কথা বলেছেন, সেগুলোর কেস নম্বর থাকলে সেগুলো যাচাই করতে পারতাম যে নোটিশ হয়েছে কি না। নথি নম্বর জানলে আমার পক্ষে বাকিটুকু যাচাই সম্ভব হবে।”
সার্বিক বিষয়ে গাজীপুর জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠালে তিনি উত্তর দেননি।
